মহামন্দার ধাক্কায় ইউরোপ-আমেরিকা বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে ধরাশায়ী, সেখানে ২০১৩ সালে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডার প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার ৩ শতাংশের মতো। যা কি-না তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়ে বেশি। চলতি বছরে এ হার আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ভবিষ্যদ্বাণী মতে চলতি বছরে গড়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যা এশিয়ার বাইরের কোনো অঞ্চলের জন্য সর্বাধিক। এমনকি ব্রাজিল, রাশিয়া, মেক্সিকো ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর চেয়েও বর্ধিত অংকের। এ প্রসঙ্গে আইএমএফ যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে তা হলো মাথাপিছু আয়। দেখা গেছে, আফ্রিকানদের মাথাপিছু গড় আয় ভারতীয়দের চেয়ে বেশি। আফ্রিকার অন্তত ডজনখানেক দেশ এ ক্ষেত্রে চীনের চেয়েও এগিয়ে। আরো আশ্চর্যের বিষয়, এ মহাদেশের লোভনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে তেল ও হীরার বিকিকিনি খুব বেশি অবদান রাখছে না। গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে জিডিপি অর্জিত হয়েছে তার দুই-তৃতীয়াংশের মূলে ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের পণ্য উত্পাদন ও সেবাখাত।
আফ্রিকার কোনো কোনো দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে ঈর্ষণীয় হারে। কিন্তু সেসব খবর ওয়ার্ল্ড মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে না। দুর্নীতির রাহুগ্রাস সত্ত্বেও কয়েকটি দেশে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপ্লব আর তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। তাই কেনিয়া ও বোতসোয়ানোর মতো দেশে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সংশোধিত রিপোর্টে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করার মতো। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রেট লেকের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয়, বিশেষ করে কেনিয়া, তানজানিয়া ও হর্ন অফ আফ্রিকা খ্যাত ইথিওপিয়ায় তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। এ দেশগুলোর অর্জিত প্রবৃদ্ধি এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ চীন ও ভারতকে পর্যন্ত চমকে দিচ্ছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, আফ্রিকার একশ’ কোটি লোকের মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। অবাক করার মতো বিষয়, মধ্য আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে এমন লোকদের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও ট্যাক্সি চালকের সংখ্যাটাই বেশি। অস্থায়ী অবকাঠামোতে বসে ব্যবসা করা ক্ষুদে দোকানির পাশাপাশি গৃহপরিচারিকা পর্যন্ত আছে এ শ্রেণিতে। আফ্রিকা রাইজিং গ্রন্থের লেখক বিজয় মাজাবান তাঁর এক ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, দুর্নীতি ও অপশাসনের বদনাম থাকলেও ইদানীংকালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আফ্রিকায় ঘটে যাচ্ছে অর্থনৈতিক বিপ্লব। আর তার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। এসব কারণেই কেনিয়া ও বোতসোয়ানোর মতো দেশে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘আফ্রিকা ইনফ্রাস্ট্রাকচার কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত বছর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশ। তাছাড়া বিমান ও স্থলপথে পণ্য পরিবহন এবং টেলিযোগযোগ খাতের শেয়ার বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয়। যেমনটি ঘটেছিলো ১৯৯০’র দশকের শেষ দিকে চীন ও ভারতে। আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য, ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বুরুন্ডি ও মালাউই’তে দক্ষ জনশক্তির বড্ড অভাব। তবে ঘানা, বোতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা ভিন্ন। উল্লিখিত দেশ তিনটিতে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। কয়েকটি রিপোর্ট থেকে এ ব্যাপারে মিলেছে অভূতপূর্ব তথ্য। জানা গেছে, বিদেশে শিক্ষা গ্রহণের পর শুধু গত বছরই নাইজেরিয়ায় ফিরেছে ১০ হাজার দক্ষ লোক। এ্যাঙ্গোলাতেও প্রতি বছর ফিরছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দক্ষ পেশাজীবী, যারা স্থানীয় শ্রমবাজারে এখন কাজ করছে সুনামের সঙ্গে। পারিপার্শ্বিক এসব অবস্থা বিবেচনায় বিশ্বের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভারতের পরই দক্ষ জনশক্তির অঞ্চল হবে আফ্রিকার দেশগুলো। যার পথ ধরে দ্রুতই আরো বিকশিত হবে আফ্রিকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পল কোলিয়ারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে।
পল কোলিয়ারের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৯৫৪টি আফ্রিকান কোম্পানির অর্জিত মুনাফা গড়ে প্রতি বছর ১১ শতাংশ। একই সময়ে সমানসংখ্যক চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশীয় কোম্পানির চেয়ে যা বেশি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এশিয়ার তুলনায় সহজলভ্য কাঁচামাল ও কম খরচে শ্রমিক নিয়োগ। এর মধ্যে আফ্রিকার মোবাইল অপারেটরদের মুনাফার হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে নেসলে, ইউনিলিভার ও সুইসপোর্টের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও মুনাফার হার ঈর্ষণীয়। তাই ২০০৮ সালে সারা বিশ্বে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ কমে গেলেও আফ্রিকার চিত্র ছিল উল্টো। ওই বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছিল ১৬ শতাংশ। অর্থের অংকে যা ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ১শ’ ৯০ কোটি) মার্কিন ডলার। শিল্প ও বাণিজ্যবান্ধব আফ্রিকা দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না— এ অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস অনুসরণে
