‘এটাই যেন হয় শেষ অপহরণ’

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০৭
‘অপহূত স্বামীকে অক্ষত ফিরে পাওয়াই ছিল একমাত্র চাওয়া—পেয়েছি। আর এ ঘটনাই যেন হয় শেষ অপহরণের ঘটনা। আর যেন কাউকে এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে না হয়।’ ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে নিজের বাসায় গতকাল শুক্রবার বিকালে সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই বলছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় তার পাশে বসা ছিলেন স্বামী গার্মেন্টস ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক। নিজের পরিবার নিয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করে তিনি নিরাপত্তা দেয়ার দাবি করেন। রিজওয়ানা বলেন, তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিক নিরাপদে ফিরলেও তারা পরিবার নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না। রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীরা দুইদিন ধরে আমার পাশে ছিলেন। সারাদেশের মানুষ আমার স্বামীর অপহরণের ঘটনাটিকে নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখেছেন। আসলে আমি জানি না কীভাবে আপনাদের এই ঋণ শোধ করব। এখানে কৃতজ্ঞতা জানালে কম হয়ে যায়।’ রিজওয়ানা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রিজওয়ানা বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সমর্থন ছাড়া এত দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘সব অপহরণই ঘৃণ্য। সব অপহরণের ঘটনাকেই সমান গুরুত্ব দেয়া হয় না। তবে এই ঘটনাকে গুরুত্ব দেয়ায় আপনাদের (গণমাধ্যম কর্মীদের) সামনে হাসিমুখে বসতে পেরেছি। এজন্য সবাইকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা।’ রিজওয়ানা জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদসহ সবাইকে তাদের উদ্বেগ প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ জানান। রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমার স্বামী ফিরে এসেছেন, তারপরও আমরা নিরাপদ বোধ করছি না। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। এটাই যেন হয় এ দেশে এ ধরনের শেষ ঘটনা। এতদিন যাদের পরিবারে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে তাদের অবস্থা এখন আমি নিজে বুঝতে পারছি।’ অপহরণের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষম হবে বলে আমি আশা করি।’ স্বামীকে ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে কারো সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে কারো সঙ্গে তার কোনো সমঝোতার প্রশ্ন ওঠেনি। সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার একটাই চাওয়া ছিল, স্বামীকে অক্ষত ফিরে পাওয়া। পেয়েছি। সরকারের সঙ্গে বিরোধের কোনো ইস্যু নেই। তাই সমঝোতার প্রশ্নই আসে না।’ স্বামী অপহরণের দিন গত বুধবার এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, তার কাজের কারণে যারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তদন্তে তাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। গতকালের সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করে তার ভবিষ্যত কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে রিজওয়ানা বলেন, ‘আমার কাজের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কেউ যদি অপহরণ করে থাকেন, তারা হয়তো ভাবতে পারেন- এর মধ্যদিয়ে তারা আমাকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখবেন। তবে তাদের বলছি, বেলার কার্যক্রম থেকে আমি কোনোভাবেই বিরত থাকব না। এই ঘটনা নিয়ে সাময়িক কিছুদিন ব্যস্ত থাকতে হতে পারে। এরপর নিজের কাজে মনোযোগ দেব।’ অপহরণের ঘটনায় দায়ের মামলা সম্পর্কে রিজওয়ানা বলেন, ‘উদ্ধার হওয়ার পর এ ব্যাপারে আমার স্বামী আবু বকর সিদ্দিক আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি তাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে কতক্ষণ সময় লেগেছে, স্পট থেকে বাসায় পৌঁছাতে এবং ফিরে আসার সময় যেখানে রিকশা নিয়েছেন সেখানে আসতে কত সময় লেগেছে, অপহরণকারীরা তার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে, তাদের ভাষা কেমন ছিল—সবই বলেছেন।’ তদন্তের স্বার্থে পুরো বিষয়টি বলতে রাজি হননি তিনি। রিজওয়ানা বলেন, ‘স্বামীর কাছ থেকে আমি যতটুকু শুনেছি—ওকে ধরে নেয়ার পর থেকে তারা যেসব কথাবার্তা ওর সামনে বলেছে তাতে ও বুঝতে পারেনি কেন তাকে অপহরণ করা হয়েছে। তাকে গাড়িতে বসিয়ে টাকার কথা আলোচনা হলেও বাসার ফোন নাম্বার নেয়নি এবং ওকেও টাকার কথা বলেনি। আবার আটকে রাখার এক মুহূর্তে ওকে বলেছে, তুমি কে? তোমার পরিচয় কি? যে তোমাকে নিয়ে সারাদেশে শোরগোল শুরু হয়েছে।’ রিজওয়ানা বলেন, অপহরণকারীদের এসব বক্তব্য ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের পাঁচ সদস্যের কমিটি হয়েছে। আশা করি এই কমিটি ঘৃণ্য এই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করবে। সাংবাদিক সম্মেলনের এক পর্যায়ে আবু বকর সিদ্দিক অপহরণের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, তাকে তুলে তিন ঘন্টার মতো গাড়ি চলেছে। এর মধ্যে দুটি ফেরিও পার হয়েছে। প্রথম ফেরি পার হওয়ার পর গাড়ি বদল করেছে অপহরণকারীরা। দু’টি ফেরির মধ্যে সড়কের দূরত্ব ছিল আধা কিলোমিটারের মতো। কোন নির্যাতন করেনি জানিয়ে আবু বকর বলেন, “আমাকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে পরিবেশ দেখে ও আশপাশের লোকজনের ফিশফিশানি শুনে মনে হয়েছে আগেও এখানে অনেক মানুষকে ধরে রাখা হয়েছে। সব সময় তার চোখ বাধা থাকত। শুধু বাথরুমে যাওয়ার সময় খুলে দিত। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১০টার দিকে ‘বড় ভাইয়ের (বস্) মতো একজন এসে বললেন, তোকে মেরে ফেলেও লাভ নেই, আবার ছেড়ে দিলেও লাভ নেই। তবে ছেড়ে দিলে কিছু লাভ হতে পারে। তাকে গাড়িতে তুলে এক ঘন্টার মতো চালানোর পর মিরপুরের পাইকপাড়ায় নামিয়ে দেয়।’ প্রসঙ্গত, গত বুধবার দুপুরে অপহরণের পর বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে কলাবাগানে আবু বকর সিদ্দিককে পায় পুলিশ। অপহরণকারীরা মিরপুরের আনসার ক্যাম্প এলাকায় চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় বলে জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার সকালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জে। সেখানে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর আদালতে জবানবন্দি দেন তিনি। বিকাল ৫টায় ঢাকায় নিজেদের বাসায় ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিদ্দিক-রিজওয়ানা দম্পতি।