খুলনা শিপইয়ার্ড

রুগ্ন থেকে লাভজনক শিল্প

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০৮
 তৈরি করছে আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধ জাহাজ, বিভিন্ন ধরনের নৌযান ও শিল্প কারখানার যন্ত্রাংশ  বিদেশি ক্রেতাদের দৃষ্টি কেড়েছে নবনির্মিত যুদ্ধ জাহাজ  নৌ-বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় গত অর্থবছরে নিট লাভ করেছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা এক সময়ের রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ডে এখন তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধ জাহাজ। তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নৌ-যান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রাংশ। বড় সুখবর হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠানের জাহাজ বিদেশি ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর দীর্ঘদিনের চেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠান এখন একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। গত অর্থ বছরে এটি নিট লাভ করেছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। অথচ নব্বই দশকেও এটি লে-অফ ঘোষণার উপক্রম হয়েছিল। শুধুমাত্র নিষ্ঠাবান এবং মেধাসম্পন্ন নৌ বাহিনী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বই এই প্রায় মৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্জীবন দান করেছে। এখন সরকারের লাভবান শিল্প প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড। সরকারের লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি হয়ে উঠেছে অনুকরণীয় মডেল। খুলনা শহরে রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকারী এই প্রতিষ্ঠান। সমপ্রতি ইত্তেফাকের খুলনা অফিসের স্টাফ রিপোর্টার রেজাউল করিমকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রতিনিধি সরেজমিনে শিপইয়ার্ডটিতে যান। সেখানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ৫৫ বছরের পুরাতন এই শিপইয়ার্ডটিকে মৃত অবস্থা থেকে কিভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, তার বিস্তারিত তথ্য জানান। জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে তত্কালীন ‘পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ (পিআইডিসি) পশ্চিম জার্মানির বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স স্টাকেনসন’কে খুলনায় একটি আধুনিক শিপইয়ার্ড নির্মাণের জন্য নিযুক্ত করে। ১৯৫৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৫৭ সালের ২৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শিপইয়ার্ড উত্পাদন শুরু করে। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। পরে জার্মান ও ব্রিটিশ ব্যবস্থাপনায় শিপইয়ার্ডটি পরিচালিত হয়। ১৯৬৫ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ এর পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর খুলনা শিপইয়ার্ডের দায়িত্ব পায় ‘বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’। প্রথমদিকে খুলনা শিপইয়ার্ড মোটামুটি সফলভাবে পরিচালিত হলেও আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা লোকসানের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ে। নব্বই দশকে এসে লোকসানের ভারে এটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ওই সময় সরকার খুলনা শিপইয়ার্ডকে ‘রুগ্ন শিল্প’ হিসাবে চিহ্নিত করে। শিপইয়ার্ড কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর তত্কালীন সরকার খুলনা শিপইয়ার্ডকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক করার লক্ষ্যে নৌবাহিনী প্রধানকে চেয়ারম্যান করে গঠন করা হয় একটি ‘বোর্ড অব ডাইরেক্টরস’। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তাকে। নিয়োগ দেয়া হয় কিছু চৌকস ও মেধাবী কর্মকর্তা এবং নাবিককে। নৌবাহিনী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা। সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিরলস প্রচেষ্টায় অতীতের পুঞ্জিভূত লোকসান কাটিয়ে শিপইয়ার্ডটি পরিণত হয় একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে। সূত্র জানায়, শিপইয়ার্ডটি ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে নিট লাভ করেছে ২৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে ২৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ও বিগত ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ৪১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। বর্তমানে শিপইয়ার্ডটিকে আরো আধুনিক ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বড় অত্যাধুনিক জাহাজ নির্মাণ করার শেড। একসঙ্গে ২টি বড় জাহাজ এবং ৪টি ছোট জাহাজ ওই শেডে নির্মাণ ও সংস্কার করা যায়। নৌ বাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত করে থাকে খুলনা শিপইয়ার্ড। এ ছাড়া বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের জাহাজ এ শিপইয়ার্ড থেকে তৈরি ও মেরামত হয়ে থাকে। নৌ বাহিনী দায়িত্ব গ্রহণ করার পর এ পর্যন্ত এখানে তৈরি করা হয়েছে ১০৫টি নৌযান এবং মেরামত করা হয়েছে ৪৮৩টি নৌযান। এর আগের সময়কালে ৬৮৫টি নৌযান নির্মাণ ও ২১১৮টি মেরামত করা হয়। সম্প্রতি এই শিপইয়ার্ড থেকে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জন্য ৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করা হয়েছে। ২০১৩ সালে সর্বশেষ যুদ্ধ জাহাজটি ডেলিভারি দেয়া হয়। যুদ্ধ জাহাজগুলো বিদেশি ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ জাহাজ ক্রয় করার জন্য অনেকে শিপইয়ার্ড ঘুরে গেছেন। শিপইয়ার্ডের নির্মাণ ও মেরামত কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিদেশে এই জাহাজ রপ্তানি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। শিপইয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, নিজস্ব প্রযুক্তির ওই যুদ্ধ জাহাজ দিয়েই এখন সমুদ্রে নিরাপত্তা টহল দিচ্ছে নৌ বাহিনী। বিদেশ থেকে এ সব জাহাজ ও নৌযান কিনতে সরকারের কোটি কোটি ডলার ব্যয় হতো। অথচ দেশেই স্বল্প খরচে তৈরি করা যাচ্ছে এই যুদ্ধ জাহাজ। আর বিদেশে এই জাহাজ রপ্তানি শুরু হলে দেশের অর্থনীতির চাকাই ঘুরে যাবে বলে আশা করছেন শিপইয়ার্ড কর্মকর্তারা। বর্তমানে নৌবাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব এনডিসি, পিএসসি’র দিক-নির্দেশনায় ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর এরশাদ আহমেদের পরিচালনায় শিপইয়ার্ডে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের কার্যক্রম চলছে। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) হিসাবে ক্যাপ্টেন আমিনুর রহমান ও জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাকশন) হিসাবে ক্যাপ্টেন সাজেদুল করিম দায়িত্ব পালন করছেন।