শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, খেলার মাঠ খেলার জন্যই ব্যবহার হবে। এখানে কোনো অপকর্ম করতে দেয়া হবে না। খেলার জন্য স্থাপনা গড়ে উঠবে শুধু খেলার জন্যই। এখানে বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। এলাকার স্থানীয়রা খেলাধুলা করতে পারবে। গতকাল শনিবার ক্লাব আঙ্গিনায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সম্প্রতি ধানমন্ডি ক্লাব মাঠ নিয়ে বিতর্ক উঠায় গতকাল দুপুরে ক্লাব টেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। এতে ক্লাব সভাপতির সাথে ছিলেন বাফুফের সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন, বিবিসির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, স্বাধীনবাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না, সাবেক ক্রীড়াবিদ ইব্রাহিম সাবের, সাবেক ফুটবলার শামসুল ইসলাম মঞ্জু, ক্লাব কর্মকর্তা শওকত আজীজ রাসেল, নজীব আহমেদ, মুশফিকুর রহমান, কামরান আলী বেগ, আকবর আলী মর্জি, মুশফিকুর রহমান মোহন, মাহফুজা আক্তার কিরন, রিজিয়া পারভিন, এবিএম সিদ্দিক, হাসান আহমেদ কিরন প্রমুখ।
এই কর্মকর্তরা বলেন, ‘ক্লাবের এই বিপদের দিনে আমরা সবাই ছুটে এসেছি। ধানমন্ডির পুরোনো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বর্তমান পরিবেশের প্রশংসা করেন। একই সাথে তারা উত্কণ্ঠা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, কেন পরিবেশবাদিরা বুঝতে পারছেন না এখানে খেলাধুলা হচ্ছে। এক সময় এই মাঠে যে খারাপ পরিবেশ ছিল, এখন তা নেই। সম্পূর্ণ খেলাধুলার জন্যই গড়ে উঠেছে পুরো মাঠের পরিবেশ। আমরা সেটা উপভোগ করছি। এলাকার পরিবেশ ভালো হয়েছে। সুন্দর হয়েছে। কেন এখানে ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।
২০০৯ সালে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব নামে রূপান্তর হওয়ার পর খেলাধুলায় এই সংগঠনটির সাফল্য তুলে ধরা হয় ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে। পেশাদার ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন, ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন, পোখারা কাপ চ্যাম্পিয়ন, আইএফএ শিল্ডে রানার্সআপ, মহিলা ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন, স্বাধীনতা কাপ ফুটবলে রানার্সআপ, প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে উন্নীত হওয়াসহ অনেক সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয় বড় পর্দায়। দেখানো হয়েছে এক সময় এই মাঠে গরুর হাট বসতো, মেলা হতো, দেখে বুঝার উপায় ছিল না এটি খেলাধুলার মাঠ। ছিনতাই, রাহাজানি আর অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভয়ারণ্য ছিল ধানমন্ডির মাঠ।
তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না বলেন, ‘এখানে দেখতাম দোকানপাট বাজার বসেছিল, ধুলায় চলা ফেরা করাও কঠিন ছিল। বৃষ্টি হলে কাদায় ভরে যেতো। আর এখন দেখছি চমত্কার মাঠ, খেলাধুলার জন্য দারুণ একটা স্থান।’
বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন বলেন,‘৬৩ সাল থেকে এখানে বড় হয়েছি। আমার কথা হচ্ছে ভালো কাজ করা অন্যায় কিনা। আজ থেকে যারা ৫ বছর আগে এই মাঠের সামনে দিয়ে গেছেন তারা বস্তি দেখেছেন এখানে। এখন এখানে দৃষ্টি নন্দন মাঠ হয়েছে।’ ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘শেখ জামাল যখন খেলতে যায় তখন আপনারা পাড়ার লোকেরা খেলা দেখতে আসুন। মঞ্জুর কাদের নতুন প্রজন্মকে খেলা উত্সাহ দিচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি এতো সুন্দর মাঠ দেখিনি ঢাকায়। যারা এমন মাঠ তৈরি করেছে তাদের পুরস্কার দেয়া উচিত। ঢাকায় এ ধরনের আরো ২০টা হওয়া উচিত।’
মাঠের পূর্ব পাশে ফুটবল অনুশীলন হয় আর পশ্চিম দিকে এলজিআরডি দেড় কোটি টাকা ব্যয় করে খেলাধুলার জন্য টেনিস কোট, বাস্কেটবল কোট, ব্যাডমিন্টন কোট এবং পূর্ব দিকে চারটি ক্রিকেট পিচ তৈরি করে দিচ্ছে। বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ‘সালাউদ্দিন ভাই ঠিকই বলেছেন এ ধরনের আরো ২০টি মাঠের দরকার খেলাধুলার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ধানমন্ডির বাসিন্দা। এখানে বড় হয়েছি। টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট পিচ হচ্ছে, তার মানে কী ? তার মানে এখানে খেলাধুলা হচ্ছে। খারাপ লাগে একটি মহল মনে করে ক্রীড়াঙ্গন তাদের সম্পত্তি। দুঃখ লাগে ডাহা মিথ্যা কথা বলে বিভ্রান্ত করছে অনেকে। কাদের ভাই যদি খারাপ করে আমরাও আপনাকে ছাড়বো না।’
বিওএ’র মহাসচিব সৈয়দ সাহেদ রেজা বলেন, নতুন প্রজন্মকে কিছু দিতে হলে খেলাধুলা করতে দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘যখনই কেউ এই দেশের কোনো কাজে এগিয়েছে। তখনই একটা স্বার্থান্বেষী মহল বাধা দিচ্ছে। ধানমন্ডি মাঠে পরিবেশ বিরোধী কিছু চোখে পড়ছে না। এই মাঠেই তো গাঁজার আসর বসতো, ছিনতাই ঘটনা ছিল অহরহ। এখন যেটা করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
ক্লাব সভাপতি মঞ্জুর কাদের লিখিত বক্তব্য পাঠ করে ক্লাবের ইতিহাস বর্তমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটির এই আঙ্গিনা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদচারণায় মুখরিত। তিনি এখানে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। স্বাধীনতা উত্তর ধানমন্ডি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল। এই ক্লাবে খেলছেন শেখ জামাল। যখন মাঠের চারদিকে দেয়াল ছিল না। গবাদি পশুর চারণ ভূমি, নেশাখোর ও বখাটেদের অভায়ারণ্য ছিল। মাঠের সামনেই ছিনতাই হতো। এই মাঠের আশেপাশে কেউ ফ্ল্যাট কিনতে চাইতেন না। কারণ মা বোনেরা স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারতেন না। এই মাঠে পতিতারা স্থান করে নিয়েছিল। তখন প্রতিবাদিরা কেউ এগিয়ে আসেনি, মাঠ বাঁচাতে কেউ মিছিল করেনি। আজ আমরা সবুজ মাঠ এবং নিরাপদ স্থান গড়ে তুলেছি। মাঠ ঘিরে চার পাশে গড়ে উঠছে সুদৃশ্য মনোরম আধুনিক ফ্ল্যাট। এটা হয়েছে এই ক্লাবের সংগঠকদের চেষ্টায়।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ট্রাষ্টের অনুমোদন নিয়ে শেখ জামালের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব গঠন করা হয়েছে। আমরা আদালতের আদেশ অমান্য করিনি। আদালত বলেছে খেলাধুলা করতে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে ভাসমান পতিতা মাঠ ব্যবহার করবে।’ অন্য আরেক প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর কাদের বলেন, ‘ধানমন্ডির বাসিন্দারা মাঠ ব্যবহার করবেন।’
