আসুন আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করি

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:৩৩
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, আপনারা অনেক ভুল ও অপরাধ করেছেন। এখনও সময় আছে, আসুন একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করি। আমরা কেউ কারও শত্রু নই। এরশাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অতীতেও আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেছি, তাহলে এখন কেন পারবো না। আসুন দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করি। আমরা দেশকে স্বাধীন করেছি। সবাই মিলে বাংলাদেশকে গড়তে চাই। এদেশ সম্ভাবনার। যদি সত্যিই আপনারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আসুন একত্রে কাজ করি। দেশ গড়ার কাজে আপনারাও আসুন, আমাদের আপত্তি নেই। গতকাল শনিবার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের দু’দিন-ব্যাপী জাতীয় সম্মেলন ও কেন্দ ীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানান। খালেদা জিয়া বলেন, যতোই সংবিধান দেখান এবং এরশাদকে নিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই- এই ‘অবৈধ’ সরকার বেশিদিন থাকবে না, আপনাদের হাতে সময় খুব কম। বিদায় নিতেই হবে। জনগণ এ সরকারকে বিদায় করতে প্রস্তুত। শুধু বিদায় নয়, বিদায়ের পর তাদেরকে জনগণের কাছে হিসাব-নিকাশও দিতে হবে। মানুষ অপরাধের হিসাব দেয় পরকালে আল্লাহর কাছে, কিন্তু এ সরকারকে জনগণের কাছেই জবাব দিতে হবে। তারা কোথায় কী কী কাজ করছে, কোথায় টেন্ডারবাজি করছে, কোথায় টাকা-পয়সা সরাচ্ছে, সবকিছুর তথ্য আছে। বিদায়ের পর তারা এসব অভিযোগ খন্ডাতে পারবে না। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ, বিচারবিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)সহ গোটা প্রশাসন সরকার দলীয়করণ করেছে। কিন্তু প্রশাসন কী জিনিস, তা আমরা জানি। আপনারা (সরকার) যখন বিদায় নেবেন, তখন এরা আপনাদের চিনবেও না। এখন অস্ত্র দিয়ে সবাইকে দমিয়ে রেখেছেন। কিন্তু জনগণ যেভাবে রাস্তায় নামতে শুরু করছে, তাতে মনে হচ্ছে- এই অস্ত্র একদিন আপনাদের দিকেই তাক হবে। এমনিতেই এখন বন্ধুহীন হয়ে পড়েছেন, তখন আরও বন্ধুহীন হয়ে পড়বেন। বসবাসের জন্য হয়তো বিদেশে আপনাদেরকে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন খুঁজে বের করতে হবে। তাই সরকারকে বলবো, জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়ার স্বার্থে লজ্জা-শরম থাকলে অবিলম্বে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। আপনারা যদি মনে করেন অনেক উন্নয়ন করেছেন, আপনারা অনেক জনপ্রিয়- তাহলে নির্বাচন দিতে ভয় কেন। অবাধ নির্বাচনে আসুন, দেখি জনগণ কাদেরকে রায় দেয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের আন্দোলনকে ‘সম্পূর্ণ সফল’ দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমাদের আন্দোলন কখনও বৃথা যায়নি। এবারও যারা বলছেন আন্দোলন বৃথা, তারা আসলে জানেনই না-আন্দোলন কী, তারা জানে শুধু আঁতাত। বরং আমাদের এবারের আন্দোলন সবেচেয়ে বেশি সফল। কারণ ওই আন্দোলনে জনগণ সমর্থন জানিয়েছে। তিনি বলেন, যদি আন্দোলন সফল না হতো তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ভিন্নরূপ পেতো। সরকার আমাদের সিনিয়র নেতাদের জেলে নিয়েছিল, এমনকি আমাকেও বন্দি রেখেছিল। ওই অবস্থায় আমরা জনগণকে নির্বাচন বর্জন ও ভোটকেন্দে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ ঘর থেকে বের হয়নি, ভোটকেন্দে ও যায়নি। খালেদা জিয়া বলেন, এ সরকার জনগণ থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন, তেমনি পৃথিবী থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সবাই বলছে গণতন্ত্রের স্বার্থে সকলের অংশগ্রহণে অতিদ্রুত একটি অবাধ নির্বাচন দেয়া জরুরি। গণতন্ত্র না থাকলে দেশের কী অবস্থা হয়, তা এখন সবাই উপলব্ধি করছেন। তিনি বলেন, দেশ আজ কঠিন সময় পার করছে। কোনো মানুষের জীবনই নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগের লোকজন ছাড়া অন্য কেউই ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নন। সারাদেশের মানুষসহ পৃথিবী যখন আবু বকর সিদ্দিকের (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি, বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী) অপহরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলো, তখন অবৈধ সরকার তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। ছেড়ে না দিলে তাদের পরিস্থিতি ভয়াবহ হতো। তাকে ছেড়ে দিয়ে সরকার কিছুটা হলেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি প্রধান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সত্যিকারের দল হলো বিএনপি। সীমান্ত পাড়ি দেয়া ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো অবদান নেই। তারা বলে জিয়াউর রহমান নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেননি, আপনারা সেটি দেখবেন কীভাবে। কারণ জিয়া যখন রণাঙ্গনে, আপনারা তখন ছিলেন থিয়েটারে। খালেদা জিয়া বলেন, পানির অভাবে তিস্তা, মেঘনা, পদ্মাসহ আমাদের সব নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির ওপর আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এ সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে গার্মেন্টস খাতও ধ্বংসের মুখে। রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তরা ঠিকমতো ক্ষতিপূরণ পায়নি। সরকার চাঁদা তুলেছে, বিদেশের সাহায্যও নিয়েছে। কিন্তু তা ঠিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু বড় বড় কথা বলে। অথচ কৃষকরা তাদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যামূল্যও পাচ্ছে না। তারা রাস্তায় আলু ও পিঁয়াজ ঢেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, গরীব আরও গরীব হচ্ছে। দেশ ফোকলা হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে সরকারের নজর নেই। তারা ফালতু কাজে অর্থ নষ্ট করছে। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট খেলায় কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলো। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার নামে খরচ করা হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে শ্রমিকদের উন্নয়ন করা যেতো। তা না করে সরকার শুধু নিজেদের ছবি প্রচারে ব্যস্ত। শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীসহ দলের সর্বস্তরের কর্মীদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, নেতৃত্ব থেকে বয়স্কদেরও বাদ দেয়া যাবে না, তাদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে হবে। দলকে সঠিক পথে সামনে এগিয়ে নিতে তারা নতুনদের উপদেশ দেবেন, পরামর্শ দেবেন। নগরেও ভালো নেতা নিয়ে আসতে হবে। এভাবে ছাত্রদল, যুবদল, কৃষক দল, মহিলা দলসহ সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে গতি সঞ্চার করতে হবে। সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জনগণ আজ অবরুদ্ধ। সরকার কাউকে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে দিচ্ছে না। সম্মেলনে সভাপতিত্বকারী ও শ্রমিক দলের সভাপতি নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে হলে লড়তে হবে, সেই লড়াইয়ে জিততেও হবে। আজ রবিবার সকাল ১০টায় একই স্থানে সংগঠনের কাউন্সিল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।