আমাদের নগরজীবনে বর্ষবরণ উত্সব আজ এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সার্বজনীন এই উত্সবে দিন দিন যুক্ত হচ্ছে নানা মাত্রা। বাড়ছে পরিধি। প্রসারিত হচ্ছে নানা আয়োজনের রঙ, রূপে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মতে, ’৬৮’র প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে শুরু হওয়া এই উত্সব আজ যত বড় হোকনা কেন, সে সময়ের বাস্তবতায় তা ছিল সমান গভীর ও প্রাণের উত্সরণ। সে যাই হোক দিন দিন ইট, কাঠের আর ক্রমেই পশ্চিমা সভ্যতায় এগিয়ে যাওয়া শহরের মানুষ আজ নিজের শেকড়ের টানে নববর্ষ পালন করছে। নিজের প্রজন্মের কাছে কৃষ্টি, এতিহ্য, স্বকিয়তা তুলে ধরে এই উত্সবের স্বার্থকতা বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল্লা খান। অন্যদিকে এই উত্সব আয়োজনে নানা অংশে নারীর অংশগ্রহণ বলে দেয়, ‘নারী যেন উত্সবের প্রাণ’।
কেনাকাটা
বর্ষবরণ উত্সবকে কেন্দ্র করে ধুম পরে কেনাকাটায়। এই কেনাকাটা শুধু পোশাক আর নিজেকে সাজানোর অনুসঙ্গ ছাপিয়ে আজ বেড়েছে ঘর সাজানোর দেশীয় শোপিস, আলন, ঝার, ছিকা, মুখোশ, টেরা কোটার পুতুল, ঢোল, মাটির পুতুল, মঙ্গলঘট, সরা প্রভৃতি। আবার সৌখিন নারীরা বৈশাখের পান্তা ইলিশ আর ভর্তা খেতে কিনছেন মাটির জিনিসপত্র। এমনই একজন নূসরাত জাহান। একটি বেসকারি সংস্থায় আছেন। তিনি জানান, তার অফিসের বর্ষবরণ উত্সব হয় বৈশাখের দ্বিতীয় দিন। সেজন্য অফিস সাজাতে তিনি রঙিন পানির কলস, জার আর প্রদ্বীপ ভাসাতে জালা কিনলেন। পহেলা বৈশাখ তার বাড়িতেই কাটবে স্বজনদের সাথে। সেজন্য রয়েছে তার আলাদা প্রস্তুতি। রসনা বিলাসে যেমন তিনি নিজের হাতে রান্না করবেন দেশী ভর্তা ভাজি, তেমন পরিবেশনও করবেন মাটির বাসন কোসনে।
রান্না আর বাজার
নাজমুন নাহার ডলি। হাতির পুল বাজার থেকে ৪টি এককেজির কিছু কম ওজনের ইলিশ কিনলেন ৩২শ টাকায়। ডলি জানিয়েছেন, তিনদিন আগে কিনছেন বলে ভাল মাছ সস্তায় পেয়েছেন। দামের দিকে দেখে আর কি হবে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, বছরের এই উত্সবে সবাই মিলে খাই। কিনতেই হয় আমাদের। ওরা তাই দামও বাড়িয়ে দেয়। ডলি কি রান্না করবেন জানতে চাইলে বলেন, সকালে আর দুপুরে আমার বাসায় ভাইবোন আর ননদ দেবরের আসার কথা। আমি সকালের জন্য পান্তা ইলিশের পাশাপাশি শুটকি ভর্তা, কলার মোচা ভর্তা, আলু ভর্তা, মরিচ, বেগুন, টমেটে, শিম, টাকি মাছের ভর্তা করবো গতবছর আমি বার রকমের ভর্তা করে সবাইকে সারপ্রাইজ দেই। এবারও দুই এক পদ বাড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা আছে বলে তিনি জানান। দুপুরের আয়োজনে থাকবে, সাদাভাত, পোলাও, মুরগি, গরুর মাংস, সরষে ইলিশ, রুই মাছের মাথার মুড়ো, কাচকি মাছের চড়চড়ি, বেগুন ভাজা করার ইচ্ছা আছে বলে জানান। তাছাড়াও অতিথিদের নাস্তার জন্য মোয়া, নাড়ু, মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, রাখেন।
ঐতিহ্য কে ধরে রাখা
বৈশাখ আর ফালগুনে শহরের টপস, পতুয়া পরা মেয়েরা শাড়ি, আলতা আর কাচের চুড়িতে সেজে একেবারে বাঙালি নারী হন! শুধু নিজের জন্য নয়, স্বজনদের জন্যও তারা এই সকল সাজের অনুসঙ্গ কেনেন। শহরের মেয়েদের চুলে ফিতা আর পায়ে আলতা, খাড়ু, নাকে নোলক, গলায় মাধুলি এই উত্সবেই পরতে দেখা যায়। নিজেরাতো সাজেনই সাথে ছোট ছোট মেয়েদেরও মায়েরা আড় পেরে শাড়িতে সাজান বাঙালি নারীর সাজে।
নিরাপত্তা দিল ওরা
বর্ষবরণ উত্সব ঘিরে নিরাপত্তা দিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেয়া কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। এই নিরাপত্তা বলয়ে ছির নারী আইন-শৃংখলা বাহিনীর স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রমনা বটমূলে অন্তর ও বর্হি বেষ্টণীর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়য়র সহকারি উপ-পুলিশ কমিশনার (উইমেন্স সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন) মুক্তা ধর। তিনি ভোর ৪টা থেকে ছিলেন বটমূলে। মুক্তা বলেন, আমদের দায়িত্ব থাকে পুলিশ হিসেবে উত্সব করতে আসা মানুষের নিরাপত্তা দেয়া। আমরা আমাদের দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করি। নারী হওয়ায় আমরা জানি এরকম ভীড়ে নারীদের কিছু অন্যরকম নিরাপত্তাহীনতাও থাকে, তাই আমরা সে দিকটায়ও নজর দেই। অনেক তরুণ-তরুণী একসাথে উত্সবে আসে তারা যেন নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাতে পারে তা আমরা নিশ্চিত করি। বৈশাখের সাজ-পোশাক না করে দায়িত্বটা যথাযথ পালন করেই আমরা অনেক আনন্দিত হই।
আয়োজনের সঙ্গে
বর্ষবরণের প্রধান আকর্ষণ হল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছয়ানটের শীর্ষে আছেন দেশের বরেণ্য রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও সঙ্গীতজ্ঞ সনজিদা খাতুন। তিনিই দেশের শান্তি আর মঙ্গল কামনা করেন এই উত্সব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে। চারুকলার শোভাযাত্রা আয়োজনেও সমানভাবে নারী শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণ চোখে পরে।
এ প্রসঙ্গে প্রস্তুতি তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কোহিনূর আক্তার বিথি বলেন, প্রতিদিন আমাদের বিশ থেকে বাইশ হাজার টাকার সরা, পাখি, মুখোশ বিক্রি হয়েছে। এই ফান্ড দিয়েই আমরা শোভাযাত্রা পরিচালনা করি। শিক্ষার্থীরা রাতদিন কাজ করেছে। কে মেয়ে কে ছেলে সে বিষয়টি ছিলনা।
তিনি বলেন, সকল শ্রেনি-বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ভাগে কাজ করেছেন। শুধু কি তাই সব রান্নার প্রস্তুতি সেরে মধ্যরাত অবধি কাজ করে পরের দিন বর্ষবরণ উত্সবে সামিল হয়েছেন। কারো কারো শিশু অংশ নিয়েছেন খেলাঘর কচিকাচাঁর আসরসহ নানা শিল্পসাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পী হয়ে। সেটার প্রস্তুতিও নিয়েছেন নারী।
ছবি: সাইফুল ইসলাম
