স্মৃ তি তে এ কা ত্ত র

বোনের চোখে শহীদ নীপা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪২
একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস। দু’শ ছেষট্টি রাত। বিংশের একাত্তর থেকে একবিংশ? আবহকাল শহীদ বড়বোনের স্বপ্ন, আদর্শ আর ভালোবাসায় পথ চলছেন নীরা লাহিড়ী। আজও শহীদ বড়বোন নীপা লাহিড়ীর কথা কেউ জানতে চাইলে তার বুকফাটা চিত্কারে চারদিক ভারী হয়ে উঠে। একাত্তরে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া নীরা লাহিড়ীর চোখে বড় বোনের মৃত্যুর সে সময়ের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় থেমে যান। তবে তিনি বলতে চান এবং সবাইকে জানাতে চান তার বড় বোনের কথা। বড় বোন নীপা লাহিড়ী তখন ঢাকা মেডিক্যালে ডাক্তারি ২য় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বড় বোন যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং কার অধীনে যুদ্ধে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং চিকিত্সার সাহায্য করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত পাক হানাদার বুকে গুলি করে বড় বোনকে মেরেছিল। তারপর তাকে শীতলক্ষ্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাকে দাহ করারও সুযোগ ছিল না। সেই কথাগুলিই ডা: নীরা লাহিড়ীর জীবনের একমাত্র কথা। এদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের যে অবদান সেখানে অনেক অজানা অবদানের মাঝে তার বোন নীপা লাহিড়ী একজন। তার কথা যেন ভুলে যাওয়ার মত নয়। এজন্য নীরা লাহিড়ীর জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ এবং পদক্ষেপের অনুপ্রেরণা হল তার বড় বোন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নীপা লাহিড়ীর যুদ্ধের দৃশ্য। পূবাইল থেকে কালীগঞ্জ পর্যন্ত এবং গ্রেনেট ছুড়তে গিয়ে কাপড়ে আগুন লেগেছিল। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বড় বোন নীপা লাহিড়ী সম্পর্কে বলেন তার মত এত স্বদেশ প্রেমী মুক্তিযোদ্ধা তিনি আর দেখেননি। শহীদ বড় বোনের চোখে তখন তিনি দেখতেন শুধু স্বাধীনতার স্বপ্ন। যুদ্ধ জয়ের পর দেশ কখন স্বাধীন হবে সেই স্বপ্ন এবং সেই সময় কখন আসবে। সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়েছে এবং দেশ স্বাধীনও হয়েছে কিন্তু তার বোন দেখে যেতে পারেননি সেই দেশ, স্বাধীনতার দৃশ্য, মানচিত্র ও পতাকা। মেডিক্যালে পড়া ছাত্রী তার বড় বোনসহ এদেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মা, দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত এবং নাম না জানা আরও হাজারও শহীদের কথা সবই যেন ধোঁয়ার মত মাঝে মাঝে মনে হয়। কারন এখনও ‘সংখ্যালঘু’ ভেবে নির্যাতিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষেরা। আজও নদীর জলে চোখের জল মিশে যায় শরণার্থীদের। নীরা লাহিড়ীর মেধা সম্পন্ন অভিমান ফনা তোলে যখন শিশুটিও আক্রান্ত হয় ‘সংখ্যালঘু’ তকমায়। আক্রান্ত হয় সমাজের বিধি স্থাপত্য। আজন্ম রাজনীতি সচেতন নীরা লাহিড়ী স্বদেশ চিন্তায় অন্বিষ্ট বিশ্বভুবন। মানবতাহীন বিশ্বকে যেন সংক্রান্তির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় নীরা লাহিড়ী লেখা কবিতা এবং ভাবনা চিন্তাগুলি। চিকিত্সা শাস্ত্রের পাশাপাশি অসম্ভব লেখনীয় শক্তি নীরা লাহিড়ীর। তবে তার লেখার অনুপ্রেরণাও তার বড় বোন নীপা লাহিড়ীর কথা। তার একটি কষ্ট হলো নীপা লাহিড়ী যুদ্ধের আত্মাহুতি কথা অজানা রয়ে গেছে। মা ও বাবার মেঝ সন্তান নীরা লাহিড়ী। নীরা লাহিড়ীর জন্ম ১৯৫৯ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হতে এম.বি.বি.এস এবং তদানীন্তন পি.জি হাসপাতাল হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাবা অধ্যক্ষ শিবপ্র্রসন্ন লাহিড়ী বাংলাভাষার অভিধান-প্রণেতা। মা অধ্যাপিকা রমা লাহিড়ী বাংলা সাহিত্য আর ভাষা তত্ত্বের গবেষক। ছোটবেলা এমন সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা ডা. নীরার। বিদ্যালয় থেকে মেডিক্যাল কলেজ এবং মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাহিত্য আর সংস্কৃতির নানা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হওয়া নীরা লাহিড়ীর আত্মপ্রকাশ খুবই কম। তার প্রথম প্রকাশিত বই হলো ধরিত্রী। বাংলাদেশের প্রথম নারী রেডিওলজিস্ট নীরা লাহিড়ী ডাক্তার হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বড়বোন নীপা লাহিড়ীর অপূর্ণ ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে। ১৯৭১ সালে নীপা লাহিড়ী তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ২য় বর্ষে এম.বি.বি.এস পড়ছেন। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর সাথেই বড় বোন নিপা লাহিড়ী। ডা. আলিম চৌধুরী হলে থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছেন। নীরার সামনে এখন আদর্শ হচ্ছেন অসমসাহসিকা বোন নীপা। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে একমাত্র মেডিক্যাল ছাত্রী মুক্তিযোদ্ধা নীপা লাহিড়ী শহীদ হলেন কালিগঞ্জ বর্ডারে। সেদিন নীরা কান্না মুছে শপথ নিলেন শহীদ বড়বোনের অপূর্ণ ইচ্ছার রূপকার হতে। ডাক্তারি পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের জটিল পথ পাড়ি দিয়ে মানবতার উত্তরসূরি নীরা লাহিড়ী এগিয়ে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকে মনে প্রাণে ধারণ করেন তিনি। তিনি চান আগামী প্রজন্ম তার বোনের মত সাহসী মুক্তিযোদ্ধার আত্মাহুতির কথা জানুক এবং আগামী প্রজন্ম সেই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন থেকে উত্সাহ ও অনুপ্রেরায় এগিয়ে যাক।