স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা

কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর?

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪৪
শেখ ফজলল করিম ১২৮৯ বঙ্গাব্দের (১৮৮২ সাল) ৩০ই চৈত্র বর্তমান লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা বাজার গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আমিরউল্লাহ সরদার এবং মাতা কোকিলা বিবি। তাঁর পারিবারিক ডাক নাম ছিল মোনা। ছোটবেলা থেকেই কবির লেখা-পড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল, তিন-চার বছর বয়সে তিনি বাড়ী থেকে পালিয়ে স্কুলে চলে যেতেন। তিনি পাঁচ বছর বয়সে কাকিনা স্কুলে ভর্তি হন। প্রায় প্রতি বছরেই বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তিনি পুরস্কৃত হতেন। ফজলল করিম মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম কবিতার বই সরল পদ্য বিকাশ হাতে লিখে প্রকাশ করেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে তাঁকে রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি করা হলে তিনি তা ছেড়ে কাকিনা স্কুলে ফিরে আসেন। সেখান থেকেই ১৮৯৯ সালে মাইনর পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। এরপর আবারও রংপুর জেলা স্কুলে দেয়া হলে স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনায় মন বসাতে না পেরে সেখান থেকে আবারও ফিরে আসেন এবং জ্ঞানার্জনে উত্সাহী হয়ে প্রচুর বই পড়তে থাকেন। পড়াশোনা ছাড়ার পর জ্ঞান চর্চা, সংবাদপত্র পাঠে তিনি অনেক সময় ব্যয় করতেন। এ সময় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যচিন্তা তাঁকে গভীরভাবে দোলা দিতেথাকে। সাহিত্য চর্চার সুবিধার্থে তিনি নানা পত্রপত্রিকা, পুস্তক সংগ্রহ করতেন। সে সমস্ত সংগ্রহ নিয়ে তিনি ১৮৯৬ সালে নিজ বাড়িতেই করিম আহামদিয়া লাইব্রেরি নামে একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার তৈরি করেন। এভাবে সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে তিনি অনেক ঠাট্টা উপহাসের শিকার হন কিন্তু প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কারণে দূর্বার গতিতে চলতে থাকে তাঁর সাহিত্য চর্চা। সাহিত্যের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহের কারণে কর্মজীবন ফজলল করিমকে তেমন ভাবে আকর্ষণ করতে পারেনি। ছোটবেলাতেই হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সা আয়ত্ত করেছিলেন যা তিনি কাজে লাগাতেন গ্রামের দরিদ্র মানুষের সেবায়। তিনি বাড়িতে বসেই দরিদ্র মানুষের চিকিত্সা করতেন। সাহিত্য সৃষ্টি, প্রকাশনা ও সাধনার প্রতি ফজলল করিমের প্রচণ্ড ইচ্ছা এবং আগ্রহ থেকে তিনি নিজ বাড়ীতে আর পীরের নামানুসারে সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ ফজলল করিমের পরিচিত মূলত কবি হলেও তাঁর জীবনী ও প্রকাশনা অনুসন্ধান করলে দেখা যায় তিনি কবিতা বা কাব্য ছাড়াও বহু প্রবন্ধ, নাট্যকাব্য, জীবনগ্রন্থ, ইতিহাস, গবেষণামূলক নিবন্ধ, সমাজ গঠনমূলক ও তত্ত্বকথা গল্প, শিশুতোষ সাহিত্য, নীতি কথা চরিত গ্রন্থ এবং অন্যান্য সমালোচনামূলক রচনা লিখেছেন। পুঁথি সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর পরিচিত পাওয়া যায়। তাঁর প্রকাশিত অপ্রকাশিত প্রায় ৫৫টি গ্রন্থ রয়েছে। ফজলল করিম রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তৃষ্ণা (১৯০০), পরিত্রাণ কাব্য (১৯০৪),ভগ্নবীণা বা ইসলাম চিত্র (১৯০৪), ভুক্তি পুষ্পাঞ্জলি (১৯১১) অন্যতম। অন্যান্যের মধ্যে উপন্যাস লাইলী-মজনু, শিশুতোষ সাহিত্য হারুন-আর-রশিদের গল্প, নীতিকথা চিন্তার চাষ, ধর্মবিষয়ক পথ ও পাথেয় প্রভৃতি অন্যতম। এছাড়া প্রচারক, নবনূর, কোহিনূর, বাসনা, মিহির ও সুধাকর, ভারতবর্ষ, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, আরতি, কম্পতারু শিশু সাথী, মোসলেম ভারত মাসিক মোহাম্মদী, বসুমতী ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় শেখ ফজলল করিমের অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সমকালীন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তার অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। গদ্য ও পদ্য উভয় শাখায় তাঁর সমুজ্জ্বল উপস্থিতি। ভাবের গভীরতাকে সরলভাবে উপস্থাপন করা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতির পক্ষে কাজ করে গেছেন। জীবনকালেই তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। বাসনা সম্পাদনার সময় রোমিও-জুলিয়েট সম্পর্কিত তাঁর একটি কবিতা পাঠ করে তত্কালীন হিন্দু সাহিত্যিকেরা তাঁকে বাংলার শেক্সপিয়র আখ্যা দেন। পথ ও পাথেয় গ্রন্থের জন্য তিনি রৌপ্যপদক লাভ করেন। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে সাহিত্যবিশারদ উপাধিতে ভূষিত করেন। চিন্তার চাষ গ্রন্থের জন্য তিনি নীতিভূষণ, কাশ্মীর শ্রীভারত ধর্ম মহামণ্ডল তাকে রৌপ্যপদকে ভূষিত করে। সূত্র: উইকিপিডিয়া