কঠিন পরীক্ষার মুখে রাহুল

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ২২:০৮
নেহেরু-গান্ধী পরিবার গত কয়েক দশক ধরেই ভারতের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। এখন উত্তরাধিকার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের উপরই সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের শেষ আশা-ভরসা। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন জরিপে পরাজয়ের বিরাট সম্ভাবনার কথা বললেও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি প্রতাপগড় শহরের রামলীলা ময়দানে জনসমাবেশ করেন তিনি। তীব্র গরমের মধ্যেও ৭ হাজারের মতো মানুষ জড়ো হয়েছিলো ঐ সমাবেশে। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও বাসে করে দলীয় কর্মীরা সমাবেশে আসছিলো। সব বয়সীদের দেখা গেছে এই সমাবেশে। আশে-পাশের আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কংগ্রেস নেতারাও এসেছিলেন সমাবেশে। রাহুল গান্ধীর আগে তারা বক্তৃতা করছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ভোজপুরি ভাষার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা রবি কিষাণ। তিনি বলেন, ইতালি কিংবা ইউরোপের কোনো সমুদ্র সৈকতে মদের গ্লাস হাতে বিলাসী দিন কাটাতে পারতেন রাহুল গান্ধী। কিন্তু তিনি তা না করে আমাদের মাঝে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যের মাধ্যমে রাহুল গান্ধীর ত্যাগের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যিনি স্বস্তির জীবন ছেড়ে ভারতের রাজনীতির মতো কঠিন জীবন বেছে নিয়েছেন মানুষের কল্যাণের জন্য। সমাবেশে রাহুল গান্ধী গত ১০ বছরে তাদের সরকারের অর্জনের কথা তুলে ধরেন। তার নানা পরিকল্পনার কথাও জানান। সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াই বলেন, দায়িত্বের এই পালাবদল বলা চলে মসৃণভাবেই হয়েছে। চলমান লোকসভা নির্বাচনকে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে রাহুল গান্ধী দেশের ভিতর ছুটে বেড়িয়েছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে আমেথির পাশে প্রতাপগড়ে এক জনসমাবেশে বিশাল সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি। ঐ আমেথি থেকে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ছোট পর্দার অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানি ও আম আদমি পার্টির (এএপি) কুমার বিশ্বাস। এএপির আহবায়ক পঙ্কজ শুক্লা এখন কুমার বিশ্বাসের নির্বাচনী প্রচারণা দেখাশুনা করছেন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের অনুন্নয়নের জন্য আমেথিবাসী খুবই ক্ষুব্ধ। তবে এ মত সব আমেথিবাসীর নয়। তাদের অনেকেই দরিদ্রতা, খারাপ রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের ঘাটতি বিষয়ে অভিযোগ করলেও রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করতে আগ্রহী নন। তারা রাজীব গান্ধীর সময়কার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা এখনো স্বীকার করেন। তাদের সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গাটা হলো কংগ্রেস কখনো ভারতীয়দের বিভক্ত করেনি। যেমনটা হিন্দু, মুসলমানদের নিয়ে বিজেপি করেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। সাহাবখত মিশ্র নামে এক ব্যক্তি বলেন, তাদের গ্রামের সবাই রাহুল গান্ধীকেই ভোট দেবে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, রাহুল গান্ধীরই জয় হবে। বিশাল ব্যবধানেই তার জয় হবে। কৃষক নাঈম খান বলেন, আমেথি থেকে রাহুল গান্ধী অবশ্যই জয় পাবে। কারণ তিনি হারলে আমাদের জন্যই বড় ক্ষতি হবে। স্থানীয় সাংবাদিক স্মিতা গুপ্তা বলেন, ২০০৪ সালে রাহুল গান্ধী যখন রাজনীতিতে নাম লেখান তখন এই আসন থেকেই নির্বাচন করেছিলেন। সে সময় অনেক আমেথিবাসী বলেছিলো- তারা কোনো এমপিকে নির্বাচিত করছেন না বরং একজন প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচিত করছেন। রাহুল গান্ধী তখন টগবগে যুবক, ভালো চেহারা ও প্রভাবশালী পরিবার থেকে এসেছেন। সেবার রাহুল গান্ধীর জন্য এখানকার জনগণের প্রবল উত্সাহ ছিলো। তার প্রতি আশাও অনেক ছিলো। ২০০৯ সালের নির্বাচনেও সে ধরনের আবেগ কাজ করেছিলো। পাঁচ বছর পরও আমেথিবাসী মনে করছেন, দিল্লিতে থাকা এই মানুষটি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু বাকি ভারত তো আর আমেথি নয়। এই মুহূর্তে অনেকেই কংগ্রেস কিংবা রাহুল গান্ধীর পক্ষে বাজি ধরতে আগ্রহী নন। অর্থনৈতিক ধীরগতি, দুর্নীতির অভিযোগ, মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণেই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের প্রতি অনেক ভোটারই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। জনমত জরিপগুলো বলছে, কংগ্রেস এবারের নির্বাচনে বিরোধীদল বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হতে যাচ্ছে। যদিও এজন্য রাহুল গান্ধীর তেমন কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও সমালোচকরা তার প্রতি একটু কমই সহানুভূতিশীল। অনেকের মতে, রাহুল গান্ধী একজন অস্পষ্ট ও সাদামাটা নেতা। বিজেপি নেতা অরুন জেটলি বলেন, নেতা হিসেবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি রাহুল গান্ধী। তিনি ভারতে গ্রহণযোগ্য নন। তার ব্যবহারে বিনয় আছে। কিন্তু কংগ্রেসের ক্যাডারদের অনুপ্রাণিত করা নিয়ে তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এছাড়া অর্থনীতি নিয়ে তার বোঝাপড়া নিয়েও সন্দেহ আছে। তবে কংগ্রেসের মত একেবারেই ভিন্ন। রশিদ কিদওয়াই বলেন, সবাই বারাক ওবামা হতে পারবেন না। আর রাহুল গান্ধী খারাপ করেছেন তাও কিন্তু নয়। কংগ্রেসের বর্তমান দুরবস্থার জন্য তাকে দোষী করাও ঠিক হবে না। তিনি গত ১০ বছর ধরে পার্লামেন্টের সদস্য। তার বিরুদ্ধে কোনো কেলেঙ্কারি শোনা যায়নি। তার সততা নিয়ে কখনো প্রশ্নই ওঠেনি। তার মতে, এবারের নির্বাচন রাহুল গান্ধীর জন্য ভাঙা-গড়ার মতো কোনো বিষয় নয়। ভারতে বর্তমান মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বকারীদের গড় বয়স ৬৫ বছর। অনেক বর্ষীয়ান নেতা তাদের ৭০ থেকে ৮০ বছরের পরও ভালো করেছেন। নেতাদের নিজেদের গুছিয়ে নিতে সময় লাগে। রাহুল গান্ধীর বর্তমানে বয়স ৪৩ বছর। তার জন্য অনেক সময় পড়ে রয়েছে। তবে কংগ্রেসের খাদের কিনারে চলে যাওয়া সম্মানকে ফিরিয়ে আনা রাহুলের কাছে এক বিরাট ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে হাজির হয়েছে। স্মিতা গুপ্তার মতে, এবারের নির্বাচনে যে জয় আসছে না তা মেনে নিতে অনেকটাই মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে কংগ্রেস। তারপরও নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ দলকে নেতৃত্ব দেবে সে কথা চিন্তাও করা যায় না। নির্বাচনের পর ফল যা হোক না কেন রাহুল গান্ধী তার অবস্থান ও গুরুত্ব হারাবেন না।