মালয়েশিয়ার নিখোঁজ যাত্রীবাহী বিমানটি খুঁজে বের করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না। অনুসন্ধান তত্পরতায় যারা যুক্ত আছেন তারা মাঝে মাঝে এমন খবর দিয়েছেন যাতে মনে হয়েছে, এই বুঝি বিমানটি ‘পাওয়া গেছে’। কিন্তু পরদিন তারা এমন তথ্য দিয়েছেন যাতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, না বিমানটি আসলে ‘পাওয়া যায়নি’। বিমানটির অবস্থান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। এভাবে আশা নিরাশার দোলাচলে চলছে উদ্ধার তত্পরতা।
আর কিছু না হোক, মহাসাগরে অনুসন্ধান কাজের ব্যাপ্তি কমেছে। কয়েক লাখ বর্গ কিলোমিটারের পরিবর্তে এখন মাত্র কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার। অনুসন্ধানকারীরা বলছেন, এর কারণ জলতলদেশ থেকে আসা আল্ট্রাসনিক সংকেত ‘পিংগার’। তাদের বিশ্বাস, ভারত মহাসাগরে নিমজ্জিত নিখোঁজ বিমানের ব্ল্যাক বক্স রেকর্ডার থেকে রহস্যজনক ঐ সংকেত আসছে। নিখোঁজ বিমান অনুসন্ধান কাজের পুরোটাই তদারকি করছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট। তিনি কাজের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। বলেন, সংকেত তরঙ্গ যে বিমানের ব্ল্যাক বক্সের, সে ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী। তবে বিমানটি যে ভারত মহাসাগরের তলদেশেই মিলবে প্রধানমন্ত্রী অ্যাবোট এমন কথা নিশ্চিত করে বলেননি।
সম্ভাব্য ব্ল্যাক বক্সের প্রথম সংকেত পাবার পর হঠাত্ করেই বিমান অনুসন্ধান কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়া হয়। এরপরও কিছুই মেলেনি সাগর থেকে। না বিমান, না এর ধ্বংসাবশেষ। তারপরও হাল ছাড়েনি অনুসন্ধানকারীরা। সাগরে তাই নামানো হয় অত্যাধুনিক ব্লুফিন-২১ সামমেরিন। একে পানির ড্রোনও বলেন অনেকে। কিন্তু বিশেষায়িত এই সাবমেরিনের খরচ অনেক বেশি। তাই এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সবচেয়ে শ্রম ও কষ্টসাধ্য। সাগরের ১৩ হাজার ফুট নিচে সমুদ্র তলদেশের নকশা তৈরিতে সক্ষম। এ পর্যন্ত ছয়বার অভিযান চালিয়েছে ব্লুফিন। কিছুই মেলেনি। কিন্তু মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী হিশামউদ্দিন জানান, অত্যন্ত সীমিত এলাকার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রভুর কাছে সবাই প্রার্থনা করুন, যাতে বিমানের সন্ধান মেলে।
এর আগে চীনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট কিছু সতর্ক বার্তাও উচ্চারণ করেন। যেমন- মহাসাগরের কয়েক মাইল গভীর থেকে বিমানকে টেনে তোলা একটি বড় ধরনের ঝক্কি, ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। অর্থাত্ বিমান মিললেও তা উদ্ধার করতে আরো কতদিন সময় লাগবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। অ্যাবোট দাবি করেন, অনুসন্ধান কাজ সঠিক পথেই এগুচ্ছে। অনুসন্ধান কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত মার্কিন নৌ কমান্ডার উইলিয়াম মার্কস সিএনএনকে জানান, বিমানের ব্ল্যাক বক্স ঠিক যেমন করে নির্দিষ্ট বিরতিতে সংকেত দিতেই থাকে, তেমন একই ফ্রিকোয়েন্সির সংকেত তারা পাচ্ছেন ভারত মহাসাগরে। ৪১ হাজার স্কয়ার কিলোমিটারের মধ্যে এখন অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নয়টি সামরিক বিমান, একটি বেসামরিক বিমান এবং ১৪টি জাহাজ। ঐ এলাকার অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিম নগরী পার্থ উপকূল থেকে প্রায় দুই হাজার একশ’ একত্রিশ কিলোমিটার পশ্চিমে।
বিশ্লেষকরা জানান, ভিজে যাবার পর ব্ল্যাক বক্স মাত্র ত্রিশ দিন পর্যন্ত সিগনাল দিতে পারে। এই সময়ের মধ্যেই বিমান পেতে হবে। সংকেত নির্গমন বন্ধ হলে বিমান পাবার সম্ভাবনাও স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। তবে সে ত্রিশ দিন ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এই সতর্ক বার্তা দিয়েছিলেন শুরুতেই। তিনি বলেছিলেন, আশা বাড়লেও সম্ভাব্য ব্ল্যাক বক্স রেকর্ডারের সংকেত মিইয়ে যেতে বসেছে। অত্যাধুনিক বিশেষায়িত যন্ত্র দিয়ে তাই চালানো সংকেতের খোঁজ। একেবারে কাছে থেকে ছাড়া ঐ সংকেত হয়তো পাওয়া সম্ভব নয়। আর সমুদ্রের বিশাল জলরাশির উপর থেকে এই সংকেত ছাড়া এখন পর্যন্ত কিছুই মেলেনি। না বিমান, না কোন ধ্বংসাবশেষ।
গত পাঁচ এপ্রিল প্রথমবারের মতো সম্ভাব্য ব্ল্যাক বক্সের সিগনাল ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যায়। এসময়ই অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে ধারণা জন্মে, হয়তো খুব কাছাকাছি বা কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বিমান মিলবে। এরপর দু’দিন পুরোপুরি নিস্তব্ধ। আর কোন সংকেত মেলেনি। মঙ্গলবার আবারো হঠাত্ই সেই ফ্রিকোয়েন্সি মেলে। দু’বার বেশ দীর্ঘক্ষণ ঐ সংকেত পাওয়া যায়। পুরোটাই রেকর্ড করেন অনুসন্ধানকারীরা। পরে তা বিশ্লেষণ করে তারা জানান, এটা কোন প্রাকৃতিক সংকেত নয়। এমনকি কাছাকাছি কোন জাহাজ থেকেও তা আসেনি। বরং তা সম্ভাব্য ব্ল্যাক বক্সেরই হতে পারে। তবে এসব ডাটা বিশ্লেষণ আর জ্ঞানগর্ভ কথায় সন্তুষ্ট নন চীন ও মালয়েশিয়ার স্বজনহারারা। অসহায় অবস্থার মধ্যে এসব কিছু তাদের বোঝানো বেশ কঠিন। গোটা একটা বিমান ২৩৯ জন মানুষকে নিয়ে উধাও হয়ে যাবে আর এক মাসেও আধুনিক বিশ্বের কেউ তা খুঁজে পাবে না, এটা মানতে তারা নারাজ। স্বজনদের প্রশ্ন, বিমানটি সমুদ্রে পড়েছে, অনুসন্ধানকারীরা কেন এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নন! ‘খোঁজ পাওয়া গেছে- যায়নি’ জাতীয় কথাবার্তা তারা আর শুনতে রাজি নন।
