ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এটাই প্রথম নয়। বিক্ষোভ খুব বড়ও নয়। প্রত্যেকটি শহরের রাস্তায় ১ হাজার থেকে ২ হাজারের বেশি লোক হবে না। কিন্তু এখন তারা অনেক বেশি সংগঠিত এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ক্রিমিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এই অঞ্চলের রুশপন্থীদের মধ্যে সাহসও অনেকটা বেড়ে গেছে। তারা ক্রিমিয়ার মতোই আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তিনটি শহরে সরকারি ভবনগুলো দখল করেছে রুশপন্থীরা। তারা পুলিশ স্টেশনও দখল করেছে। দখলমুক্ত করতে গিয়ে সেনাদের গুলিতে এর মধ্যে কয়েকজন নিহত হয়েছে। ডনেটস্ক নামের একটি শহরে বিক্ষোভকারীরা গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা দাবি করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইউক্রেনে গৃহযুদ্ধ দেখা দিতে পারে। আর ইউক্রেন সরকার আশঙ্কা করছেন, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে ইউক্রেনকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। ফলে এখন বিশ্লেষকরাও একই আশঙ্কাই করছেন যে ইউক্রেন নামের দেশটি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে কিনা।
রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই অঞ্চল থেকেই রুশপন্থী ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে খারকিভ, ডনেটস্ক, লুহানস্ক এবং ওডেসা। এসব এলাকায় রুশপন্থী জনগণ বিভিন্ন সরকারি ভবন দখলে নিচ্ছে। ডনেটস্ক সরকারি ভবন দখলকারীরা শহরটিকে ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করে। তারা ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আগামী ১১ মে গণভোটেরও ঘোষণা দেয়। রাশিয়া সম্প্রতি গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষী এলাকা ক্রিমিয়াকে নিজেদের করে নেয়। মস্কো এই অঞ্চলগুলোর আন্দোলনকে তৃণমূলের আন্দোলন বলে অভিহিত করেছে। সীমান্তে অবস্থান করা রুশ সৈন্যরা এসব বিক্ষোভে ইন্ধন যোগোচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগামী ২৫ মে’র আগে যে কোনো ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ডনেটস্ক, লুহানস্ক এবং খারকিভ শহরে আন্দোলন আগের চেয়ে আরো জোরদার হতে পারে। কারণ ২৫ মে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগেই তারা স্বাধীনতা দাবি করতে পারে। পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অঞ্চলগুলো ইচ্ছা করলে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কারণ ইউক্রেনের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গেই ছিল। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিক আমলে ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্ত করা ভুল ছিল বলে মনে করেন তিনি।
ইউক্রেনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আলেক্সাজান্ডার তুর্কিনোভও পার্লামেন্ট আশঙ্কা করেছেন, রাশিয়ার এসব আন্দোলনে ইন্ধন দিয়ে ইউক্রেনে আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনে গুপ্তচর পাঠিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টায় মগ্ন। ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়া কিয়েভকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামে ইন্ধন দিচ্ছে। এর মাধ্যমে রাশিয়া কিয়েভকে জানান দিচ্ছে যে, এইসব অঞ্চলের নাগরিকরা চাইলে পূর্বাঞ্চলও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যদি কিয়েভ রাশিয়ার মতামতকে গুরুত্ব না দেয় তাহলে এই অঞ্চলগুলোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে পুতিন নিজের ভাষাভাষীকে রক্ষার অজুহাত দিয়ে ইউক্রেনে হামলা করতে পারে। যদিও মস্কো বারবার পশ্চিমা বিশ্বকে আশ্বস্ত করেছে যে ইউক্রেনে সামরিক হামলার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত পুতিন হামলার ক্ষমতা রাখবেন এবং সেটা তার আছে। আর হামলা হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
পূর্বাঞ্চলে আন্দোলন-বিক্ষোভে হতাশ হয়ে পড়ছেন ইউক্রেন সরকার। আন্দোলন দমাতে প্রেসিডেন্ট তার বিদেশ সফর পর্যন্ত বাতিল করেছেন। তিনি দেশটির নিরাপত্তা বিভাগের জরুরি বৈঠক করেছেন। গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধিকার করা ভবন ছেড়ে দিতে বিক্ষোভকারীদের ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়। না সরলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোরও হুমকি দেয়া হয়। তবে এরপর পুতিন অনেকটা নরম ভাষায় হুঁশিয়ার করে দেন ইউক্রেনকে। এর একদিন পরই ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার তুর্কিনোভ পার্লামেন্টে ঘোষণা দেন যে, বিক্ষোভকারীরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনা হবে না। এরপর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আরসেনি ইয়াতসেনিয়ুক রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিক্ষোভে গোলযোগপূর্ণ পূর্বাঞ্চলে আরো ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। ইউক্রেন সরকার শক্তি প্রয়োগের আল্টিমেটাম দেয়ার পর পূর্ব ইউক্রেনের লুহানেস্ক সরকারি ভবন দখল করে রাখা রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে সাহায্য কামনা করেছে। প্রেসিডেন্ট তুর্কিনোভ চাচ্ছেন যেভাবে হোক আন্দোলন দমন করতে এবং সেটা শান্তিপূর্ণ উপায়ে। কারণ অস্থিতিশীলতা বাড়তে থাকলে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ‘মানবতার’ অজুহাত তুলে এই অঞ্চলে আক্রমণ করতে পারে রাশিয়া।
ন্যাটো জানিয়েছে, রাশিয়া পূর্বাঞ্চলের সীমান্তে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। যে কোনো সময় রাশিয়া এই অঞ্চলে আক্রমণ করতে পারে এবং এজন্য নির্দেশের পর মাত্র কয়েক মিনিট প্রয়োজন হবে। রাশিয়া যে এই অঞ্চলটিতে আক্রমণ করতে পারে তার অনেক উপাদানই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বলে ন্যাটো জানিয়েছে।
