রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর ইন্টার্ন চিকিত্সকরা হামলা চালিয়েছে। গত রবিবার রাতের ওই ঘটনায় অন্তত ১২ জন সাংবাদিক আহত হয়েছে। গুরুতর আহত যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন রাসেল মাহমুদকে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার ঘটনা তদন্তে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিনকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ইন্টার্ন চিকিত্সকদের ধর্মঘটের কারণে সেখানে আগত রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে, বিডিনিউজ জানায় গত শনিবার সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনায় একুশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের মামলা করার পরপরই গতকাল অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিত্সকরা। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি, শিক্ষানবিশ চিকিত্সক মোয়াইবুল ইসলাম সোয়েব জানান, মামলার প্রেক্ষিতে দুপুর ২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে।
মিটফোর্ড ও রাজশাহীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে রাজশাহীর স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল নগরীতে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে। আজ মঙ্গলবার বৃহত্তর রাজশাহীর সকল উপজেলা সদরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। রাজশাহী টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব অপু জানান, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নগরীর রাজপাড়া থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিত্করা তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে টিভি দেখছিলেন। এসময় এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় তার অভিভাবক ইন্টার্ন চিকিত্সকদের বিষয়টি জানাতে যান। এসময় ইন্টার্ন চিকিত্সকরা ওই অভিভাবকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এনিয়ে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তারা ওই রোগীর অভিভাবকদের মারধর করেন। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান রজশাহীতে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিক। এসময় ইন্টার্ন চিকিত্সকরা রোগীকে স্যালাইন দেয়ার লোহার স্ট্যান্ড ও পুলিশের লাঠি নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। তারা সাংবাদিকদের পিটিয়ে জখম করে এবং বেশ কয়েকটি টেলিভিশনের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ভাংচুর করে।
অভিযোগ উঠেছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় ঘটনাস্থলে নগরীর বোয়ালিয়া ও রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা রহস্যজনক কারণে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হামলাকারী ইন্টার্ন চিকিত্সকদের বেশিরভাগই রামেক শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মী এবং ইন্টার্ন চিকিত্সক পরিষদের নেতা। তাদের সঙ্গে পুলিশের খাতিরের কারণেই তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
সাংবাদিকদের ওপর ইন্টার্ন চিকিত্সকদের আকস্মিক হামলার খবর পেয়ে স্থানীয় অর্ধশতাধিক সাংবাদিক দ্রুত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান রামেক হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা হামলার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার বিষয়ে কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও অভিযোগ করেন। সাংবাদিকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আরএমপি কমিশনার নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সায়েদুর রহমান ভুঁইয়াকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর ঘোষণা দেন।
সমাবেশ থেকে সাংবাদিকরা আজ মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) বৃহত্তর রাজশাহীর নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর জেলা ও উপজেলা সদরে বেলা ১১টায় বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
রবিবার রাতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর থেকেই হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিত্সকেরা হাসপাতালে কর্মবিরতি পালন করেছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগের কবলে পড়েছে হাসপাতালে ভর্তিকৃত শত শত রোগী। রবিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালের ১০, ২৪ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে তিনজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব রোগীর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে দাবি করেছে।
