টিআইবি রিপোর্ট

গার্মেন্টস উন্নয়ন সিদ্ধান্তের ৩১ শতাংশের বাস্তবায়ন

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২২
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি পরবর্তী গত এক বছরে গার্মেন্টস খাতের সার্বিক উন্নয়নে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক পদক্ষেপের মধ্যে ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্পন্ন অথবা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৩১ ভাগ ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কমবেশি অগ্রগতি হয়েছে। আর বাদবাকী ৯ ভাগ উদ্যোগের ক্ষেত্রে কোন অগ্রগতি হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে টিআইবি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রানা প্লাজা ধসের বর্ষপুর্তিকে সামনে রেখে এ গবেষণা পরিচালনা করে টিআইবি। ‘তেরি পোশাক খাতে সুশাসন:প্রতিশ্রুতি ও অগ্রগতি’ শীর্ষক এই গবেষণা কর্মের ফলোআপ প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন টিআইবি’র ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. শরীফ আহমদ চৌধুরী ও সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। গার্মেন্টস খাতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের আলাদা মন্ত্রণালয় না হওয়া পর্যন্ত ‘তৈরি পোশাক খাত সুশাসন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় এই অগ্রগতি ইতিবাচক। তবে তিনি বলেন, এর মধ্যেও অনেক উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও নিহতদের সব পরিবারের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতেই হবে। তবে তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন তার দেশের জনগণ এদেশের শ্রমিকদের রক্তমাখা পোশাক কিনবে না। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন সুলতানা কামাল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও মৌলিক জায়গায় অগ্রগতি আটকে আছে। ওই সব জায়গায় ইতিবাচক অগ্রগতি না হলে দীর্ঘমেয়াদী সুফল আসবে না। প্রতিবেদনে গার্মেন্টস খাতে এখনো বেশকিছু ত্রুটি তুলে ধরা হয়। ট্রেড ইউনিয়নের উদ্যোক্তাদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে চাকরিচ্যুত করা, ইউডি (ইউটিলিটি ডিক্লারেশন) প্রদানের কর্তৃত্ব বিজিএমইএ’র কাছে থাকা, মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ায় টিআইবি’র পক্ষ থেকে হতাশা প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রম আইনের সংশোধন, গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় নীতি প্রণয়ন, কলকারখানা পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে রূপান্তর, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন অনলাইনে গ্রহণের মত উদ্যোগের বাস্তবায়ন হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যক্রম বিকেন্দ ীকরণ, শ্রম নীতিমালা, পরিদর্শন নীতিমালা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বিষয়ক হটলাইন স্থাপনের মত উদ্যোগে অগ্রগতি হয়েছে। তবে শ্রমিকদের অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, বিজিএমইএ’র সরকারি কর্তৃত্ব চর্চা, রানা প্লাজা ধসে দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত, পরিচয়পত্রে যোগাযোগের ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর না থাকার মত বিষয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া গার্মেন্টস খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় স্থাপন, ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের কার্যাবলী সংক্রান্ত বিধিমালা, পোশাক খাতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠনের মত বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তই হয়নি বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর, গার্মেন্টস মালিকপক্ষ, ব্র্যান্ড ও ক্রেতা, শ্রমিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠন ও সংস্থার গত এক বছরের বিভিন্ন কার্যক্রম আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে সুপারিশ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, কারখানা পরিদর্শন বা জরিপের তথ্য ভুল বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ করে দেয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। সার্বিক কারণে রানা প্লাজা পরবর্তী গত এক বছরে ২০ থেকে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। যাতে অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছে। এছাড়া আরো কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুতির আশংকায় রয়েছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আলাদা দুটি পরিদর্শনে ইতিমধ্যে ১৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া শেয়ারড ভবনে (গার্মেন্টসের পাশাপাশি অন্য কার্যক্রম চলে এমন ভবন) ৫৭টি কারখানায় ১১ কোটি ডলার মূল্যমানের অর্ডার বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে কারখানার পরিদর্শন বা জরিপ সম্পন্ন না হওয়ারও আশঙ্কা করা হয়। গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বায়ার্স ফোরামের সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে বায়ার বা মালিকপক্ষের উদ্যোগ না থাকা, সরকার, বায়ার ও মালিক কর্তৃক ক্ষতিপূরণ না দেয়া, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ ও অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রানা প্লাজা থেকে পোশাক নেয়া ২৮টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ছাড়া (প্রাইমার্ক) বাকীদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব সত্ত্বেও রানা প্লাজা পরবর্তী তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। সুলতানা কামাল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করে বলেন, দায়ীদের শাস্তির আওতায় না আনলে এক বছরের অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এবং এ ধরনের ঘটনা আরো বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, মজুরির ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের স্বার্থ গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের মৌলিক বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা বা শ্রমিক স্বার্থ গুরুত্ব না পেলে বুঝতে হবে অনেক কিছুই বাকী রয়েছে। যেসব কর্তৃপক্ষের উপর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব তারা আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করছেন না বলেও অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মৌলিক স্বার্থের জায়গায় সমন্বয়হীনতা কেন ঘটবে? এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।