‘আইন ভঙ্গ’ করার জন্য মহাসড়কে চলাচলরত ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে ভয়াবহ চাঁদাবাজি চলছে বলে মালিকরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানানোর পরও কোন প্রতিকার পাওয়া য়ায়নি, উল্টা বেড়েছে হয়রানির মাত্রা। অপরদিকে মহাসড়কগুলোতে বেড়েছে গাড়ি ছিনতাই ও মালামাল চুরির ঘটনা। চাঁঁদাবাজি ও হয়রানির ঘটনা বেশি ঘটছে রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবহন মালিকরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে বলে তারা জানিয়েছেন। সারাদেশে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১০ হাজার কাভার্ডভ্যান ও ৯৬ হাজার ছোট বড় ট্রাক।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, আমরা আইন মেনেই বিআরটিএ থেকে গাড়ির নিবন্ধন নিয়ে সড়কে গাড়ি চালাচ্ছি। কিন্তু কাভার্ডভ্যান বা ট্রাকের বডি বাড়ানোর অভিযোগ তুলে রাজধানীসহ দেশের সকল পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ রেকারের নামে প্রকাশ্যে চালাচ্ছে চাঁদাবাজি। অন্য দিকে সড়ক মহাসড়কে ইদানিংকালে গার্মেন্টস পণ্য চুরি, ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। এ পণ্য পরিবহনের সঙ্গে জড়িত সবাই উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, কেউ কেউ আইন ভঙ্গের চাঁদাবাজি করছে। আবার কেউ কেউ সেবার নাম দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রেকাররা এখন শান্তিপ্রিয় পরিবহন ব্যবসার জন্য মূর্তিমান আতংক হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদেরকে বিপুল অংকের টাকা দিতে হচ্ছে।
চাঁদাবাজির পরিমাণ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোন গাড়ি আটকের পর শুরু হয় একটি মোটা অংকের টাকা নিয়ে দরকষাকষি। শেষ পর্যন্ত চালক রাজি না হলে মামলা ঢুকে দেয়া হয়। সেখানে আট থেকে ১০ হাজার টাকা বা তারও বেশি জরিমানা আদায় করা হয়। জরিমানা রশিদে দেখানো হয় ৮ হাজার টাকা। এরমধ্যে রেকার বিল ৫ হাজার আর জ্বালানি (রেকারের) বিল ৩ হাজার টাকা।
রুস্তম আলী খান বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে বারবার এই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেও এর কোন প্রতিকার পাইনি। ফলে আমরা শান্তিপ্রিয় পরিবহন মালিকরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’
এ পরিবহন নেতা আরও বলেন, বডি বৃদ্ধি নিয়ে হয়রানি বন্ধের জন্য গত ২৪ মার্চ রাজধানীর এলেনবাড়িতে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়াম্যানের উপস্থিতে বৈঠক হয়েছে। এখানে হাইওয়ে ও ডিএমপিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় কাভার্ডভ্যান ও ট্রাকের বডি বৃদ্ধির ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত কাউকে হয়রানি করা যাবে না। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত পুলিশ মানছে না। বরং কোন কোন এলাকায় এ হয়রানির মাত্রা আরও বেশি মাত্রায় বেড়েছে। এমন প্রমাণও তাদের হাতে রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আসাদুজ্জামান মিয়া বডি বৃদ্ধির নামে চাঁদাবাজি ও হয়রানির কথা অস্বীকার করে বলেন, কাভার্ডভ্যান বা ট্রাকের বডি রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) করার সময় দেখানো হয় ২২ ফুট। কিন্তু সেখানে বাড়িয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে করা হয় ২৬ ফুট। এ পরিবর্তন আইনত দণ্ডনীয়। তিনি বলেন, সর্বশেষ বিআরটিএ-অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ ব্যাপারে ৬ মাস সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। যাতে এ সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহন মালিকরা বিষয়টি সুরাহা করে নেন। আর ঐ সিদ্ধান্তের পর দেশের কোন সড়কে পুলিশ বডি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কোন গাড়ি আটক করছে না।
তিনি আরও বলেন, তবে এ নির্দেশনার পরও কেউ যদি হয়রানি করে থাকে তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মহাসড়কে চুরি-ডাকাতি সম্পর্কে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় মহাসড়কের আইন-শৃঙ্খলা ভাল। দু’একটি ঘটনা যদি ঘটে থাকে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের বডি বৃদ্ধির ব্যাপারে মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, পণ্য পরিবহনে বাস্তবতার কারণেই তাদেরকে বডি বৃদ্ধি করতে হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আসা কন্টেইনারে (২০ ফুটের) মাল লোড হয় হাইড্রোলিক পেশার দিয়ে। আর সেই মালামাল একই মাপের কাভার্ডভ্যানে লোড করলে জায়গা হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই কাভার্ডভ্যানের বডি বাড়াতে হচ্ছে। তবে এ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিআরটিএ-এর অনুমতি নিয়েই তারা করেছেন।
ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, অর্থনৈতিক চাকাকে সচল ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসিপত্র সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌছে দিয়ে বাজার মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন পণ্য পরিবহন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সাম্প্রতিক ‘আইন ভাঙ্গা’র অজুহাতে চাঁদাবাজির জাতাকলে দিশেহারা পণ্য পরিবহন মালিকরা।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, কাল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের ৪০তম সভায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের বডি অবৈধভাবে বর্ধিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হবে।
