শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ কবে?

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫১
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি হচ্ছে আগামীকাল। আর এই এক বছর শেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে হতভাগ্য শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের ইস্যুটি। নিতহদের পরিবার, আহত বা কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সুরাহা করা গেল না আজও। বিক্ষিপ্ত কিছু অনুদান ছাড়া এই সময়ে প্রকৃত অর্থে ক্ষতিপূরণ তারা পায়নি। শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করছে, ক্ষতিপূরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। লক্ষ্য করা যাচ্ছে ক্ষতিপূরণের দায় এড়ানোর চেষ্টাও। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ক্ষতিপূরণ প্রদানে সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ বিক্ষিপ্তভাবে কিছু টাকা পাচ্ছেন। একসাথে না পাওয়ায় সেই টাকা তারা টেকসই কাজে লাগাতে পারছেন না। এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২২ কোটি ৩১ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন উত্স থেকে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের অর্থ দেয়া হয়েছে। শ্রম সচিব মিকাইল শিপার ইত্তেফাককে জানান, শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী- নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তহবিল থেকে এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৯ শতাধিক নিহতের পরিবারকে (নির্ভরশীলতার সংখ্যা বিবেচনায়) ১ লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যাদের মরদেহ শনাক্ত করা গেছে তাদের সবাই এই তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। এর বাইরে গুরুতর আহত ৩৬ শ্রমিককে ১০ লাখ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত উদ্ধারকর্মী কায়কোবাদের চিকিত্সা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১ কোটি ৩৫ লাখ এবং নিহতদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আরো ৫০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। এদিকে সরকার বা অন্যান্য উত্স থেকে দেয়া অনুদান বা ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়া শ্রমিকদের তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। গতকাল গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা অর্থ কোন কোন শ্রমিক বা শ্রমিকের পরিবার একাধিকবার পাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ একবারও পাচ্ছেন না। সম্প্রতি অ্যাকশন এইডের এক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন আহমেদও একই অভিযোগ তোলেন। রানা প্লাজার ৫টি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করা ৩ হাজার ৬৩৯ (এই সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে) শ্রমিকের মধ্যে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৩৫ জন। এর মধ্যে ২৯১ জনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে। এসব লাশের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। বাদবাকীদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ধসে পড়া ওই ভবন থেকে জীবিত উদ্ধার ২ হাজার ৪৩৮ জন যার মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার শ্রমিক আহত ছিলেন। এর মধ্যে এক বা একাধিক অঙ্গহানি হয়েছে এমন গুরুতর আহত রয়েছেন ৩৬ জন। এ ছাড়া এখনো ৯৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি। রানা প্লাজার ওই পাঁচ গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করা নিহত, আহত ছাড়াও অন্য সব শ্রমিকও কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অনুদান ছাড়াও ব্রিটিশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক সম্প্রতি ওই ভবনের ৫টি কারখানার ৩ হাজার ৬৩৯ শ্রমিকদের প্রত্যেককে (নিহতদের স্বজন) ৪৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) গঠিত তহবিল থেকে সব শ্রমিককে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়ার কার্যক্রম গতকাল মঙ্গলবার শুরু হয়েছে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার। বিজিএমইএ জানিয়েছে, সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত খরচ করা হয়েছে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে চিকিত্সা সহায়তা বাবদ ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ ৭ কোটি ৬০ লাখ, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান ২ কোটি, প্রসূতি শ্রমিকদের সহায়তা ৪ লাখ ২০ হাজার এবং উদ্ধার কাজ ও পুনর্বাসনে ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। এদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, অনুদান আর ক্ষতিপূরণ এক নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র বলেন, এখন পর্যন্ত যে টাকা নিহতদের পরিবার বা আতহদের দেয়া হয়েছে তা অনুদান। এর এক টাকাও ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হওয়া ঠিক হবে না। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে যে টাকা দেয়া হয়েছে ওই টাকাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবেই ধরতে হবে’। ক্ষতিপূরণ কত হবে? রানা প্লাজা ধসের সময় তত্কালীন শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানায় দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১ লাখ টাকা। তবে এ অঙ্ক নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এ অবস্থায় হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের তত্কালীন জিওসি চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীকে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন প্রদানের নির্দেশ দেন। তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি নিহত, নিখোঁজ ও গুরুতর আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ সাড়ে ১৪ লাখ টাকা, আর আহত শ্রমিকদের জন্য ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে। তবে এই অঙ্কটি কত হবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সুরাহা আসেনি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের ১২১ ধারায় বলা হয়েছে, নিহত বা আহত শ্রমিকের পরিবারে তার উপর যতজন নির্ভরশীল ছিল তার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন আহমদ বলেন, আইএলও কনভেনশনে যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে যুক্ত করে আরও ৫ লাখ টাকা করে থোক বরাদ্দ দিতে হবে। সেই হিসেবে নিহতদের পরিবারকে কমপক্ষে সাড়ে ১৯ লাখ টাকা করে দিতে হবে। ক্ষতিপূরণে দায় কার? ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ঠিক না হওয়ার পাশাপাশি এই টাকা কোথা থেকে আসবে তাও চূড়ান্ত হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে—এই দায় কার আর ক্ষতিপূরণ আসবে কোথা থেকে? আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র মনে করেন, প্রধান দায়টা কারখানার মালিকের হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর পোশাকের ক্রেতা আন্তর্জাতিক ব্র্র্যান্ডগুলোও দায় এড়াতে পারে না। তাই এসব পক্ষকে সম্মিলিতভাবেই দায় নিতে হবে। অন্যদিকে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর মালিকদের স্বার্থগুলো যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়েছে তত দ্রুত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টির সুরাহা হয়নি। রানা প্লাজার ৫টি কারখানা থেকে পোশাক নিত অন্তত ২৮টি ব্র্যান্ড। এর মধ্যে একমাত্র ব্রিটিশ ব্র্যান্ড প্রাইমার্ক এই হতাহতের ঘটনায় দায় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিউ ওয়েভ বটমসের ৬৮১ জন শ্রমিকের সবাইকে আইএলও’র রীতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেবে। বাদবাকী ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ৫-৬টি ছাড়া কেউই দায় স্বীকার বা ক্ষতিপূরণে এগিয়ে আসছে না। ভরসা এখন আইএলও’র উদ্যোগ ক্ষতিপূরণ নিয়ে গত এক বছরের হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ৪ কোটি মার্কিন ডলারের (৩১২ কোটি টাকা) একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন। আইএলও এবং ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল যৌথ উদ্যোগে এ তহবিল গঠন করে। এই তহবিলে কাঙ্ক্ষিত অর্থ পাওয়া গেলে নিহতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের একটি ভালো অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হবে। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র ইত্তেফাককে বলেন, এই তহবিলে সবার কাছ থেকেই অর্থ চাওয়া হয়েছে। তবে রানা প্লাজা থেকে পোশাক নেয়া ২৮টি ব্র্যান্ডের নৈতিক দায় সবচেয়ে বেশি। এই অর্থ পাওয়া গেলে নিহত শ্রমিকদের কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হবে। আহত শ্রমিকরা আরো বেশি পরিমাণ অর্থও পেতে পারেন (ক্ষতির বিবেচনায়)। সরকার, পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ এখন এই তহবিলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তবে এই তহবিলে এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার (প্রাইমার্কের দেয়া ৯০ লাখ ডলারসহ)। প্রাইমার্ক ছাড়াও বোনমার্শে, কানাডার লোবলো, স্পেনের ম্যাঙ্গে, ইন্ডিটেক্সসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে এই তহবিলে অর্থ প্রদান করেছে। অবশ্য বাদবাকী ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে কয়েকটি রানা প্লাজা পরবর্তী কারখানার অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করতে চায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তহবিলে কাঙ্ক্ষিত অর্থ না যোগাড় হলে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।