ইউএনও, ওসির গাড়িবহরে হামলা, আহত ৭

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫২
সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে গতকাল পাথর খেকোদের বিরুদ্ধে অভিযানকালে খোদ সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা। এসময় পাথরখেকোরা সড়কও অবরোধ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ১৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় একজন গুলিবিদ্ধসহ ৭ জন আহত হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে গতকাল পরিবেশ অধিদপ্তর ভোলাগঞ্জে এক অভিযান পরিচালনা করে। এসময় পরিবেশ ধ্বংসকারী পাথর উত্তোলনের ৩৫টি ‘বোমা মেশিন’ (পাথর উত্তোলনের জন্য এক ধরনের ইঞ্জিন চালিত যন্ত্র) ধ্বংস করা হয়। অভিযান শেষে ফেরার পথে ইউএনও-ওসির গাড়ি বহরের উপর দিনদুপুরে হামলা চালায় তারা। ওসি জানান, অবৈধভাবে যত্রতত্র পাথর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে গতকাল সকাল থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে কোমপানীগঞ্জের ইউএনও আসিফ বিন ইকরাম, ওসি দেলোয়ার হোসেন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান অংশ নেন। তারা কোয়ারি এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে পাথর উত্তোলনের জন্য ৩৫টি ‘বোমা মেশিন’ ধ্বংস করেন। পাথর কোয়ারি রক্ষায় এলাকায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। অভিযানশেষে ফেরার পথে বেলা সোয়া ২টার দিকে টুকেরবাজার সংলগ্ন বউবাজার এলাকায় কয়েকশ লোক সড়ক অবরোধ করে। তারা কোয়ারিতে অভিযানের প্রতিবাদে ইউএনও-ওসির গাড়ি বহরে হামলা চালায়। আহত কয়েকজনকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি অস্তিত্ব সংকটে সিলেটের সীমান্তবর্তী দেশের সর্ববৃহত্ পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জে যত্রতত্র পাথর উত্তোলনের ফলে পর্যটন সমৃদ্ধ পাহাড় নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেমন্ডিত এলাকাটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কুড়িবছর আগেও ভোলাগঞ্জে বনবনানী, লতাগুল্ম, কমলালেবুসহ নানা ফলের বাহার ছিল। ছিল বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম। এখন সেখানে বালি আর বালি। নদীর তলদেশ, নদী তীর বা উঁচু টিলা ভূমি সবখানেই চলছে পাথর খেকোদের থাবা। হারিয়ে গেছে সবুজ। এক কথায় পুরো ভোলাগঞ্জ এখন অস্তিত্ব সংকটে। ভোলাগঞ্জে একসময়ের পাথরের বিশাল মজুদকে কেন্দ্র করে ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্লান্ট নামের একটি প্রকল্প চালু হয় ষাটের দশকে। সেটি হয়েছিল রেলওয়ে স্লীপারের নিচে পাথর বিছানোর জন্য। তখন সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি বৃটিশ রোপওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি বাস্তবায়ন করে। এটি বাস্তবায়নের ফলে সীমান্ত এলাকা থেকে অল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে ছাতকে চলে আসতো ভাঙ্গা বোল্ডার পাথর। সংরক্ষিত এলাকা থেকে পাথর পরিবহনের দৃশ্য ও এর স্থাপনাগুলো ছিল মনোহর। কিন্তু সংরক্ষিত এলাকাটি অস্ত্রধারী পাহারাদারদের সাথে মিলে মিশে উজাড় করে দিচ্ছে পাথর খেকোরা। ফলে মাটির তলদেশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে বিপর্যয়ের কারণ হবে। জরুরি ভিত্তিতে এলাকাটি রক্ষা না করলে এটি হবে হারিয়ে যাওয়া আরেক ইতিহাস। ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়ার উঁচু সবুজাভ পাহাড়ী ওমঘাট নদী থেকে ধলাই নদী উত্পত্তি লাভ করে সার্পিল গতিতে নেমেছে ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে। প্রতিবছর ঢলের সাথে নেমে আসে অসংখ্য বোল্ডার পাথর। ধলাই নদীর তলদেশেও রয়েছে পাথরের বিশাল মজুদ। এই পাথরকে ঘিরে দিনে দিনে ভোলাগঞ্জে গড়ে উঠেছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। কিন্তু এক শ্রেণির পাথর খেকোদের লোলুপ দৃষ্টিতে এলাকাটি বিরানভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। ভোলাগঞ্জে পাথরের বিশাল মজুদকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠা ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্লান্ট স্থাপিত হয় ১৯৬৪-১৯৬৯ সালে। প্রকল্পের আওতায় ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত সোয়া ১১ মাইল দীর্ঘ রোপওয়ের জন্য নির্মাণ করা হয় ১২০টি টাওয়ার ও এক্সক্যাভেশন প্লান্ট। এক্সক্যাভেশন প্লান্টের সাহায্যে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাথর উত্তোলন করা হয়। অকেজো যন্ত্রপাতি ও নানা অব্যবস্থাপনায় এ পদ্ধতিতে বর্তমানে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। রোপওয়ের সংরক্ষিত প্লান্ট এলাকা থেকে যত্রতত্র পাথর উত্তোলনের ফলে গত কয়েক বছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে স্থাপনাটির বেশ কিছু অংশ। স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ বিন ইকরাম বলেন, নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে পাথর খেকোদের তাড়াতে গুলিরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা ব্যর্থ। তিনি বলেন, তাদেরকে এলাকায় সাইনবোর্ড এবং চেকপোস্ট বসানোর নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। নিরাপত্তা রক্ষীরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। রেলওয়ের নিরাপত্তা পরিদর্শক সাঈদুর রহমান বললেন, তাদের একার পক্ষে ৪৭ জন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে স্থাপনাটি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতাও পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান।