রেহানা স্বপ্ন দেখেছিলেন দু’পায়ে দাঁড়ানোর, তার মতো করেই স্বপ্ন ছিল আরেক রেহানা, শিল্পী ও জুয়েল শেখসহ রানা প্লাজায় এক বা দুই পা হারানো ২৬ শ্রমিকের। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। থাই রাজপরিবার নিয়ন্ত্রিত ‘প্রোসথেসিস’ ফাউন্ডেশন রানা প্লাজাসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় পা হারানো ১০৭ জনকে কৃত্রিম পা দেয়। গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোরে সেই পা সংযোজন করা হয়। রানা প্লাজার বর্ষ পূর্তিতে রানা প্লাজা ধসের শিকার এক অথবা দুই পা হারানো যে সকল শ্রমিক এই পা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, তারা কেউ এই পায়ের সুফল ভোগ করতে পারেননি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, একটু সমস্যা হতেই পারে । অভিযোগ করলে তা তারা শুধরে দিতেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন পাগুলো শক্ত,ভারী। চলতে অসুবিধা হওয়ায় এগুলো তারা ব্যবহার করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কৃত্রিম পা দিয়ে ছেড়ে না দিয়ে কিছু দিন ঐ পায়ে হাঁটার অনুশীলন করানোর প্রয়োজন ছিল।
সিআরপি’র নতুন পা ঃ শিল্পী, দুই রেহানা ও জুয়েল শেখ বর্তমানে সাভার পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র-সিআরপিতে আছেন। সেখানে গত সোমবার তাদের সাথে কথা হয়। রানা প্লাজা ধসে এক পা হারানো জুয়েল শেখ বলেন, কৃত্রিম পা লাগিয়ে দুই তিন পা হাঁটলেই সংযোগস্থল ছিলে যায়। পরে ব্যান্ডেজ করতে হয়, ব্যথা হয়। নড়াচড়া করা কষ্ট। তাই এগুলো ব্যবহারের চেয়ে না ব্যবহার করাই ভাল। দুই পা হারানো রেহানা বলেন, দুই পা সংযোগ করে তা তোলা কষ্টকর। লাঠির সাহায্য নিলেও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। তারা আরও জানান, বর্তমানে সিআরপি থেকে তাদের নতুন পা দেয়া হয়েছে, তাও তাদের ব্যবহারের উপযোগী নয়।
থাই ফাউন্ডেশনের পায়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পরিচালক (কার্যালয়-৩) জুলফিকার লেনিন বলেন, এই সকল বিষয়ে এ পর্যন্ত তারা কোন অভিযোগ পাননি। রানা প্লাজা ধসের বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে সাংবাদিকরা তাদের সাথে যোগাযোগ করায় তাদের মাধ্যমেই এখন অভিযোগগুলো আসছে। তিনি স্বীকার করেন অসুবিধা হতেই পারে । তবে তারা অভিযোগ করলে সেই অনুযায়ী সহযোগিতা করা হতো।
তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ড থেকে চিকিত্সক ও টেকনিশিয়ানদের একটি বড় দল তখন দেশে এসে তাদের পায়ের মাপ নিয়ে পা নির্মাণ করেন। তার বেশ কিছুদিন দেশে অবস্থান করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পা লাগিয়ে কিভাবে ব্যবহার করবে তাও দেখিয়ে দেন। কিন্তু আমার মনে হয় তারা যেভাবে দেখিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা সেভাবে পা ব্যবহারের চেষ্টা করেননি।
একই বিষয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোর সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের হাসপাতালের একজন সহকর্মী ও সাংবাদিকসহ অনেককেই সে সময় পা দেয়া হয়, তারা এখনও সেই পা ব্যবহার করছেন। একটা নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে কিছু সময় লাগে শ্রমিকরা সেই সময়টুকু দেয়নি। অভিযোগ নিয়ে এলে আমরা অবশ্যই দেখতাম। কিন্তু আজ অবধি রানা প্লাজার কেউ কো্ন অভিযোগ করেনি। তিনি আরও জানান, এই পাগুলো বিশ্বের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি।
অঙ্গ হারানো শ্রমিকরা এখন সিআরপির দেয়া পা পেয়েছেন। তারা জানান, এই পা-ও তাদের পক্ষে ব্যবহার করা কষ্টকর।
কেন তারা পঙ্গু হাসপাতালের দেয়া পা ব্যবহার করতে পারেননি এবং সিআরপির পা ব্যবহারে কষ্ট পাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিআরপির নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের কৃত্রিম পা প্রয়োজন অনুযায়ী হল কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য যে সময় দরকার ছিল সেই সময় দেয়া হয় নি। পাগুলো দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা বাড়িতে গিয়েও পা ব্যবহারের অনুশীলন করেননি। তাদের হাসপাতালে রেখে কৃত্রিম পায়ে অভ্যস্ত করা প্রয়োজন ছিল। যা আমরা করছি। আমরা তাদের কৃত্রিম পা দিয়ে হাঁটায় অভ্যস্ত করতে সিআরপিতে রেখে দিয়েছি।
এদিকে শ্রমিকরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাদের এক পা হারানো শ্রমিকদের ১০ লক্ষ এবং দুই পা হারানো শ্রমিকদের ১৫ লক্ষ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। তারা এই সঞ্চয়পত্র থেকে মাসিক ইন্টারেস্ট তুলে থাকেন। যা দিয়ে তাদের সংসার চালানো দায়। রেহানা জানান, টাকা না দিলে স্বামী রাগারাগি করে এবং টাকার জন্যই তাদের বাড়ি ভাড়া করে ঢাকায় থাকতে হয়। কেননা ঢাকার বাইরে থেকে এই টাকা তোলা যায় না। তাই তারা জানতে চান কবে তারা এই টাকা হাতে পাবেন এবং ঢাকার বাইরে থেকে টাকা তোলা যাবে কি না। এ বিষয়ে জুলফিকার লেনিন বলেন, তারা যেন টাকাটা তুলে ব্যয় করে না ফেলে এবং তাদের সন্তানেরাও যেন এই সুফল ভোগ করতে পারে তাই এই ব্যবস্থা। আর ঢাকার বাইরে থেকে ইন্টারেস্ট তোলার কার্যক্রম এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
