জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনায়িকা নিপুণ একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে কাজ করেও বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এই গুণী অভিনেত্রীকে নিয়ে আমাদের এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
নিপুণ যে শুধু নিজেকে চলচ্চিত্রের মধ্যেই ধরে রেখেছেন তা কিন্তু নয়। রুপালি পর্দায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নাটক, বিজ্ঞাপনসহ সব ধরনের কাজই করে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, ‘নিজেকে কখনোই আমি বৃত্তের মধ্যে বেঁধে রাখতে চাইনি। নাটকে অভিনয় করলে নাকি চলচ্চিত্রে চাহিদা থাকে না—এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করতাম না। আমি দিব্যি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক, বিজ্ঞাপন করে যাচ্ছি। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিটি শাখায় নিজের বিচরণ ঘটাতে চাই আমি। তবেই না অভিনয়ের পূর্ণ স্বাদ পাব।’ ২০০৮ সালে শাহ আলম কিরণ পরিচালিত ‘সাজঘর’ ও ২০০৯ সালে মোহাম্মদ হোসেনের ‘চাঁদের মতো বউ’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নিপুণ। এত অল্প সময়ে যার এত অর্জন তার অনুভূতি কী রকম? ‘মাঝেমধ্যে আমার নিজের কাছেই অবাক লাগে অভিনয়ে নিজের অবস্থান দেখে। একমাত্র আমার বড়বোন ছাড়া আর কেউ-ই ভাবেনি আমি বিনোদন জগতে নিজেকে তুলে ধরতে পারব। আমার নাচ দেখে আপু সবসময় বলতেন, ‘তুই অভিনয় কর, দেখবি অনেক ভালো করবি।’ আপুর কথায় আমি শুধু হাসতাম। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমি ভালো গল্পের ছবিতে অভিনয় করার চেষ্টা করেছি। হয়তো এ জন্যই এত তাড়াতাড়ি আমি দর্শকদের মনে স্থান পেয়েছি। দুইবার দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছি। এটা অবশ্যই আমার জন্য একটা বিরাট ব্যাপার। আমি মনে করি, এ স্বীকৃতি অভিনয়ের প্রতি, যা চলচ্চিত্রের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে।’ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে রাশিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে পেয়ে যান গ্রিন কার্ড। সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি চাকরিও। তারপর দেশে বেড়াতে এসে হুট করেই জড়িয়ে পড়েন অভিনয়ের সঙ্গে। শুরুর দিকে অভিনয়টা শখের বসে করলেও এখন সেটা পেশা হয়ে গেছে নিপুণের। ‘সত্যি আমি শুরুর দিকে অভিনয়টাকে শখ হিসেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু যখন অভিনয়ের জন্য ২০০৮ সালে জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি পেলাম তখন আমি সিরিয়াস হলাম। পরিবারের সবাই আমাকে উত্সাহ দিল। যদিও প্রতিযোগিতার বাজারে আমার জায়গাটা করে নিতে একটু কষ্ট হয়েছে। তার পরও নিজের অভিনয়গুণে সবাইকে ছাপিয়ে আমি এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমি জানতাম, ভালো কাজের ফলাফল ইতিবাচকই হবে’, বলছিলেন নিপুণ। চলচ্চিত্র, নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্র—এসব নিয়েই মাসের ৩০ দিন ব্যস্ত থাকেন নিপুণ। সম্প্রতি তিনি নতুন আরেকটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। নাট্যনির্মাতা নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের নির্দেশনায় একটি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানের ফেসওয়াশের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। নিপুণ বলেন, ‘সবসময়ই চেষ্টা করেছি আমি ভালো প্রোডাক্টের ভালো গল্পের বিজ্ঞাপনে কাজ করতে। নঈম ইমতয়াজ নেয়ামুল ভাইয়ের কাছে বিজ্ঞাপনটির কনসেপ্ট শোনার পর ভীষণ ভালো লেগেছে। আশাকরি দর্শকেরও ভীষণ ভালো লাগবে।’
অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরু থেকে নিজের একটা দর্শন মেনে পথ চলছেন তিনি। আর তা হলো অনেক বেশি কাজ করার চেয়ে একটু কম কাজ করবেন। সংখ্যার চেয়ে তিনি কাজের মানের দিকে বেশি নজর দেন। এর ফলে কাজ নিয়ে কখনও তার মাঝে কোনো অস্থিরতা দেখা যায়নি। নিপুণের ভাষ্যে, ‘আমি কখনও এমনটি চাইনি যে, আমাকে অনেক অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে হবে, সবসময় বড়পর্দায় নিজেকে দেখতে হবে—এই ভাবনা আমাকে কখনও তাড়া করেনি। আমি আসলে নিজেকে দেখতে চেয়েছি ভালো কাজের একজন অভিনেত্রী হিসেবে।’
এদিকে চিত্রনায়ক বাপ্পারাজের পরিচালনায় ‘কার্তুজ’ ছবির কাজ শেষ করেছেন নিপুণ। এই ছবিতে তার বিপরীতে আছেন সোহান খান। মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ‘আই ডোন্ট কেয়ার’ ছবির আউটডোর শুটিংয়ের কাজও শেষ করেছেন নিপুণ। এই ছবিতে তার বিপরীতে আছেন বাপ্পী ও আদি। কণ্ঠশিল্পী আগুনের সাথে শেষ করেছেন শাহ আলম কিরণ পরিচালিত ‘৭১-এর মা জননী’ ছবির কাজ। এছাড়াও তিনি শেষ করেছেন জি সরকারের নির্দেশনায় ‘লাভ ২০১৪’ ছবির কাজ। এই ছবিতে তার বিপরীতে আছেন শাকিব খান। প্রতিটি ছবি নিয়েই নিপুণ যথেষ্ট আশাবাদী। এদিকে নিপুণ সর্বশেষ সনক মিত্রের পরিচালনায় গন্ধরাজ হেয়ার অয়েলের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। সময়ের বিবর্তনে কাজ নিয়ে এখন নতুন নতুন ভাবনার ডালপালা প্রসারিত হচ্ছে তার মনে। এ প্রসঙ্গে নিপুণ বলেন, ‘আমার মনে হয়, এখন আমার কাজ নিয়ে আরও সচেতন হওয়া উচিত। আর আমি এখন তাই করছি। ক্যারিয়ারের এই সময়ে এসে আমি আমার চরিত্রে কোনো রিপিটেশন চাই না। এখন একটি স্ক্রিপ্ট পাওয়ার পর দেখি সেখানে নিজের অভিনয়ের কতটা সুযোগ রয়েছে। এখন আমি আসলে একটু ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রই খুঁজি। এই সময়ে এসে গতানুগতিক কাজ করতে কোনো ইচ্ছেই আর করে না। আমার মনে হয়, যারা আমার অভিনয় পছন্দ করেন, তারাও নিশ্চয় চান, আমি নতুন নতুন চরিত্রে তাদের সামনে হাজির হই। আমি যেহেতু দর্শকদের জন্য কাজ করি, নিজের আনন্দ থেকে কাজ করি—তাই দর্শকদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টাটা এখন থেকে আরও জোরালো হবে।’
