রয়ে যাবেন সুরে...

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪২
চলে গেলেন সংগীত আকাশের আরেক কিংবদন্তি। গুণী মানুষদের এই বিদায়ে বরাবরই গভীর এক শূন্যতা তৈরি করে। বশির আহমেদের এই অনন্ত প্রস্থানটি গানের জগতের জন্য গভীর বেদনার। তাকে নিয়ে গীতিকার, সহশিল্পী ও ছাত্রী হিসেবে পর্যায়ক্রমে স্মৃতিচারণ করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুবীর নন্দী ও কনকচাঁপা আমি তার গর্বিত সহকর্মী সুবীর নন্দী সিলেটে একটি অনুষ্ঠান হচ্ছিল। আমি তখন কিশোর। মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর সাথে সেই অনুষ্ঠানে তিনি এলেন। কিশোর চোখে তখন বশির ভাইকে দেখছি। গাইলেন। সবার মন জয় করে চলে গেলেন। এত স্মার্ট, এত দৃপ্ত কণ্ঠের কোনো শিল্পীকে সেই আমার সামনাসামনি প্রথম দেখা। এরপর আমার গানের ক্যারিয়ারে তার সাথে কাজ হয়েছে অনেক। আমি অনেক গান শুনি। রোজ সকালে বাছাই করা গানের সিডিতে আজও বশির ভাইয়ের বেশ কিছু গান রয়েছে। আমার প্রাণের বশির ভাই, আমার সহশিল্পী ছিলেন—বিষয়টি আমার জন্য অনেক গৌরবের। তার সবচেয়ে বড় দিক হলো তিনি কলকাতায় জন্মে নিজের বাচনিক দিক থেকে প্রথমে বাংলা উচ্চারণে অতটা পারদর্শী ছিলেন না। কিন্তু সেই বশির ভাই নিজের কাজের নিষ্ঠার প্রতি এতই যত্নবান যে তার গান শুনলে মনে হয় এর চেয়ে শুদ্ধ লয়ে গান হতে পারে না। যে কারো গান একবার একটানা শুনে পরে গুনে গুনে বলতে পারতেন এই ক’টা জায়গায় এই ক’টা ভুল। একজন পণ্ডিত ব্যক্তির দ্বারাই এই নিখুঁত গণনা সম্ভব। বশির ভাই তেমনই একজন ছিলেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করি। অনেক সাধের ভাইটি আমার গাজী মাজহারুল আনোয়ার আমরা এই যে মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে হৈচৈ, টকশো, সভা-সেমিনার করছি; এতে কার লাভ? বশির ভাই কি এগুলো দেখতে পাচ্ছেন? জানছেন? আধ্যাত্মবাদ নিয়ে হয়তো বলাই যায়, তিনি দেখছেন। তার আত্ম দেখছেন। কিন্তু আমার কাছে আপাতদৃষ্টিতে এ সবকিছু অর্থহীন লাগে। কারণ আমাকেও একদিন যেতে হবে। আজ আমিই বলছি। আমার মৃত্যুর পর সভা-সেমিনারের কোনো প্রয়োজন নেই। তারচেয়ে আমাকে জীবিত এই কালেই অন্তত একটা সালাম দিও। সেটিই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা হবে। বশির আহমেদকে তাই আমি মূল্যায়ন করছি গভীর এক শ্রদ্ধাবোধ থেকে। আমার লেখা ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটি রেকর্ডিংয়ের কথা আজও মনে আছে। কাজী জহিরের বাসায় হঠাত্ ডাক এলো। ছবির গান নিয়ে বসতে হবে। গিয়ে দেখি বশির ভাই বসে আছেন। ভাবলাম তিনি ছবিতে গান গাইবেন। কিন্তু না, পরে জানলাম তিনি ছবির সুরকার। ভালোলাগাটা যেন তখনই আরও খানিকটা বেড়ে গেল। আমার লেখা গানে তিনি সুর করবেন, গাইবেন। কেন জানি না, ছবির প্লটটি শুনে মাত্র এক ঘণ্টার ভেতরেই আমার লেখা হয়ে গেল। বশির ভাই সুর করার সময় হারমোনিয়ামে এত সুন্দর এক মেলোডি বাজালেন মন ভরে গেল। একেবারে এক বসাতেই লেখা সুর হয়ে গেল। তিনজনই আমরা ‘বাহ্’ বলে ফেললাম। এখন কাজী ভাই বললেন গান তো আমরা আমাদের তিনজনার জন্য করছি না। এই বলেই তিনি বাড়ির সকলকে ডাকলেন। বশির ভাই আবারও তার সুর শোনালেন। একবার শোনানোর পরই দেখি বাড়ির লোকজনও গাইতে শুরু করলেন। তখনই ভাবলাম গানটি অনেকদূর যাবে। আসলে বশির ভাই নিজের সম্পর্কে এত বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বলেই এত স্লো কিন্তু মেলোডি গান গেয়েও প্রায় সবকটি গানই কালোত্তীর্ণ করেছে। আজ এই বিদায়ের পর আমার অনেক সাধের ভাইটিকে নিয়ে যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাকছে, তখন শুধু এটুকুই ভাবি, কেন এমন আমরা? বেঁচে থাকতে কি আমি আর বশির ভাই একটা আড্ডায় বসতে পারতাম না!