রানা প্লাজা ধসে গাইবান্ধার নিখোঁজ ও নিহতদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসন হয়নি আজও
রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিখোঁজ গাইবান্ধার ১১ জনের পরিবার তাদের প্রিয় স্বজনের কোন সন্ধান গত এক বছরেও পায়নি। এদিকে ওই ঘটনায় নিহত নারীসহ ৪৯ জনের পরিবার এবং সেই সঙ্গে নিখোঁজদের পরিবারবর্গের পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থাও এখনো করা হয়নি। পরিবারগুলো তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানায়, গতবছর ঢাকার সাভারে অবস্থিত রানা প্লাজা ভবন ধসে গাইবান্ধা জেলার নারীসহ ৪৯ জন নিহত, নিখোঁজ হয় ১১ জন ও শতাধিক আহত হন। ঘটনার পর কেবল প্রধানমন্ত্রীর অনুদান হিসাবে নিহত পরিবারপ্রতি এক লাখ টাকা দেয়া হয়। এছাড়া তিন দফায় ওই পরিবারপ্রতি ৪৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নিখোঁজদের পরিবারগুলো সরকারি বা বেসরকারি কোন তরফ থেকেই সাহায্য পায়নি।
সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাঙ্গামোড় গ্রামের বাসিন্দা নিখোঁজ বীথি খাতুুনের (২১) বাবা আব্দুল বারী মিয়া বলেন, ‘ট্যাকা পাওয়া তো দূরের কতা। এক বচর হয়্যা গেলো। সোরকার হামার ছোলটার খোঁজ দিব্যার পালো না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কামলা কৃষাণি করি দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ ৫ জনের সংসার চলে না।’
নিখোঁজ কামনা বেগমের (২২) স্বামী সোনা মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘৪ বছরের কোলের ছোলটাক থুয়্যা ওই চলি য্যায়া মোর এই মাসুম বাচ্চাটার যে কি দুর্ভোগ হচে। উই সারাদিন খালি ওর মায়োকে খোঁজে। কওতো ওক কি দিয়্যা বুঝাম ?’
নওগাঁর অশনাক্তকৃত ২১, নিহত ২৩ জন
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নওগাঁর অশনাক্তকৃত রয়েছেন ২১ জন, নিহত ২৩ ও অঙ্গহানী হয়েছে ১ জনের। ঘটনার পর অশনাক্তকৃতদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে শনাক্ত করা হলেও গত এক বছরেও লাশ ফেরত দেয়া হয়নি। এদের পরিবারগুলোর দাবি—নিহতদের লাশ দ্রুত ফেরত দেয়ার। নিহতদের পরিবারগুলোকে সরকার থেকে এক লাখ হতে ৩ লাখ টাকা করে দেয়া হলেও গত এক বছরে তাদের আর কোন খোঁজ-খবর নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন অনেকে। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
অশনাক্তকৃতরা হলেন বদলগাছী উপজেলার থুপশহন গ্রামের কবির উদ্দীনের মেয়ে পপি আক্তার, বিশালবাড়ী গ্রামের ওমর আলীর ছেলে ইমরান হোসেন (২৫), মান্দা উপজেলার কাঞ্চন গ্রামের জয়নাল আবেদিনের মেয়ে সুলতানা খাতুন (১৮), বনকুড়া গ্রামের আজিজুর রহমানের মেয়ে আসমা বেগম, চাকমা শেখ গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাজিম উদ্দিন, গোসাইপুর গ্রামের মোঃ রহমানের ছেলে আব্দুস সালাম (৩৩), মহাদেবপুর উপজেলার মোজাম্মেল হকের মেয়ে ইয়াসমিন (২১), মাধবপুর গ্রামের ফরিন্দ্র নাথ বসুর ছেলে প্রভাতী চন্দ্র বসু (৫৫), নওগাঁ সদর উপজেলার আইনুদ্দীন শেখের মেয়ে মাহমুদা আক্তার (৩৫), শিকারপুর গ্রামের আলতাব হোসেনের ছেলে আল আমীন (২৪), কালুশহর গ্রামের মো. আবুল কাশেমের মেয়ে ঝর্ণা বেগম (২৩), রাণীনগর উপজেলার বাবদাগাড়ী গ্রামের মো. মোজাম্মেলের ছেলে মো. আব্দুর, আত্রাই উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাজার এলাকার ফয়েজ উদ্দীন আহম্মেদের মেয়ে মোছা. মুন্নি (২৮), রাণীনগর গ্রামের নিজাম উদ্দীনের মেয়ে বেবী আক্তার (৩০), ইসলামগাঁথী গ্রামের ছানোয়ার হোসেনের মেয়ে মোছা. সালেহা (২৮), নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দীনের স্ত্রী মোসা. ইসমতারা (৪৩), ক্যাপড়া (চাপড়া) গ্রামের কিয়ামত আলীর মেয়ে মোছা. কহিনূর (৪২), ভাতকুণ্ড গ্রামের হযরত আলীর মেয়ে নাসিমা (৩৫), হারপুর গ্রামের শওকত আলীর মেয়ে শিরিনা (২৪), পারমনিক (বাতকুণ্ড) গ্রামের নজি প্রামাণিকের মেয়ে স্বপ্না বেগম, পত্নীতলা উপজেলার হাড়পুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে লিপি (২০)।
বদরগঞ্জের ১৮ পরিবারের সবাই ক্ষতিপূরণ পায়নি
বদরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার নিহত ১৮ জন শ্রমিকের পরিবারের সকলে এখনও ক্ষতিপূরণ পায়নি। উদ্ধার অভিযানকালে এ উপজেলার ১৩জনের লাশ শনাক্ত করতে পারেন স্বজনরা। কিন্তু বাকি পাঁচ জন হতভাগ্যের লাশ শনাক্ত করতে না পারায় তাদের ঢাকায় বেওয়ারিশভাবে দাফন করা হয়। অবশ্য পরে তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করে কবর শনাক্ত করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ওই ঘটনায় নিহত হওয়া ১৮জন পরিবারের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছি সরকারের কাছে। পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে তারা অনুদান পাবেন।
