‘প্রাঙ্গণেমোর’-এর শেষের কবিতা

একটি শুরুর গল্প

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪০
ঢাকার নাটকের দলগুলোর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহিত্য নিয়ে কাজ করেনি এমন দল খুঁজে পাওয়াই কঠিন। তবে বিষয়টি এমন নয় যে ঢাকার বাইরের দল রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে কাজ করে না। এই মুহূর্তে শেষের কবিতা নিয়মিত মঞ্চায়ন করছে সময়ের জনপ্রিয় নাট্যদল ‘প্রাঙ্গণেমোর’। সর্বশেষ ‘উত্স বাংলাদেশ’ নামের একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহের অংশ হিসেবে প্রাঙ্গণেমোর ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে ‘শেষের কবিতা’ নাটকটি প্রদর্শন করে। ‘শেষের কবিতা’ দলটির ৬ষ্ঠ প্রযোজনা। দলের যুগল কর্ণধার অনন্ত হিরা ও নূনা আফরোজ যথাক্রমে নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন শেষের কবিতা নাটকটির। শেষের কবিতা একটি উপন্যাস, নাটক নয়। কিন্তু নাটক ও উপন্যাসের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। উপন্যাস পাঠক পড়ে নিজের ভেতরে রস আস্বাদন করে এক-একটা চরিত্র হয়ে ওঠে, কিন্তু নাটক দর্শন ও শ্রবণের সংমিশ্রণ, যেখানে উপস্থিত চরিত্রের কাজ দর্শকের মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখা। ফলে নাটকের আন্যতম উপাদান হলো ঘাত-প্রতিঘাত বা ডাইমেনশন। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে শেষের কবিতা একটি ফ্ল্যাট গল্প। নির্দেশকের ভাষায়—‘শেষের কবিতা’য় চূড়ান্ত কোনো সংঘাত, মান-অভিমানের প্রকাশ নেই, সবই মেনে নিচ্ছে লাবণ্য। অমিতও বড় কোনো কাণ্ড করে বসে না। সবাই বিচার না করে বুঝতে চেষ্টা করে। কেতকীর আগমনে বড় একটা সংঘাতের আভাস পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত সেও মেনে নিয়ে হীরের আংটি অমিতকে ফিরিয়ে দিয়ে চলে যায়। শোভনলালও অপমান মেনে নিয়ে মাথা নিচু করে বিদায় নেয়। মহাজ্বালা! এরা এতো মেনে নেয় কেন? নাটকে চাই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত অবস্থা। কিন্তু শেষের কবিতা হলো মিষ্টি কষ্টের প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদের উপন্যাস। তাই সার্থক নাটক হিসেবে শেষের কবিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশককে মনোযোগী হতে হয়েছে আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর। মঞ্চসজ্জা, আলো, পোশাক এবং দর্শককে আবিষ্ট করে রাখার মতো কোরিওগ্রাফি। নাট্যরূপ দেওয়াতেও বিশেষ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন অনন্ত হিরা। সবকিছু বিবেচনা করলে প্রাঙ্গণেমোরের শেষের কবিতা একটি সফল প্রযোজনা, কেননা নাটকের শেষে অমিত বা লাবণ্যের পরিণতির জন্য দর্শক হূদয়ে এক ধরনের ব্যকুলতা তৈরি হয়েছে। ঘটনার শুরু শিলং পাহাড়ের পথে বিপরীতমুখী দুটি গাড়ির পরস্পর আকস্মিক দুর্ঘটনায় পরিচয় হয় বিলাত ফেরত কিন্তু বিলেতি ভাবভঙ্গিমায় অভ্যস্ত ব্যারিস্টার অমিত রায় ও পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা প্রকৃতির প্রতিরূপ লাবণ্যের। নির্জন পাহাড়ের দুর্লভ অবসরে দুজন দুজনকে দেখে মুগ্ধ হয়, যার পরিণতি গড়ায় ভালোবাসায়। কেবলই বই পড়ে আর পাস করে জীবন কেটে যাবে বলে ভেবে ছিল যে লাবণ্য, হঠাত্ আবিষ্কার করল সে ভালোবাসতেও পারে। অন্য দিকে আধুনিক বেশভূষায়, বিদ্যা ও মননে নিজেকে অনন্য হিসেবে অধিষ্ঠা করা অমিত প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণের ফলেই সে লাবণ্যের প্রেমে পড়ে যায়। একসময় লাবণ্য আবিষ্কার করে, অমিত অপ্রতিরোধ্য, যা চাই তা তাকে পেতেই হবে। কিন্তু পেয়ে ধরে রাখার বিষয়টি নিয়ে তার কোনো ম্যাথাব্যাথা নেই। তাই অমিতকে ভালোবেসে তাকে বিয়ে করতে ভয় হয় লাবণ্যের। কিন্তু যুক্তিতর্কে লাবণ্যকে হার মানিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা প্রায় পাকাপাকি করে ফেলে অমিত। গল্পের এই বাঁকে ধূমকেতুর মতোই উপস্থিত হয় কেতকী মিত্র যার বিলেতি নাম কেটি মিটার। অমিত বিলেতে থাকা অবস্থায় কেটিকে আংটি পরিয়ে ছিল। আজ সে অধিকার নিয়েই কেটি এসেছে। অন্যদিকে খোঁজ মেলে শোভলালের, যে লাবণ্যকে ভালোবাসার অপরাধে লাবণ্যদের বাড়ি থেকে একদিন বিদায় নিয়েছিল। শোভনলাল এখনো লাবণ্যকেই ভালোবাসে। অতএব পরিণতিতে অমিত কেটিকে কেতকীতে রূপান্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করে, অন্যদিকে লাবণ্য ও শোভনলালের বিয়ের দিন ধার্য হয়। শেষের কবিতা প্রেমের উপাখ্যান এই জন্য যে, এখানে বিরহ অনুপস্থিত। যে সাময়িক বিরহ দর্শককে বিচলিত করেছে তার বহুগুণ ভালোবাসা অর্জন করেছে অমিত ও লাবণ্য। অমিত কেতকীকে বিবাহ করলেও লাবণ্য তার জীবনে থেকে গেছে দিঘির মতো। অন্যদিকে চিঠিতে লাবণ্যের শেষের কবিতায় তার অনাগত দিনে অমিতের ঋণের কথা লিখেছেন—‘হে ঐশ্বর্যবান,/ তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান—/ গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/ হে বন্ধু, বিদায়।’ এভাবে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যে ভবিষ্যতের দিকে অমিত-কেতকী, লাবণ্য-শোভনলাল অগ্রসর হয় তা একটি নতুন দিগন্তের শুভসূচনা। তাই শেষের কবিতা একটি শুরুর গল্প। যারা মঞ্চে এসেছেন তারাই মঞ্চ আলোকিত করেছেন অর্থাত্ সাবলীল অভিনয় করেছেন। প্রতিটি দৃশ্য শুরুর আগে দর্শকদের বোঝার সুবিধার্থে ঘটনা বর্ণনা করার ধারণাটি ছিল চমত্কার। কখনো কথকের আবির্ভাব আবার কখনো চরিত্র রূপদানকারী অভিনেতা নিজেই ঘটনার বিববণ দিয়ে দৃশ্য শুরু করেছেন। সংঘাত বা মিলন তত্ত্বের মতো দৃশ্যায়ন মনে রাখবার মতো, কেবল কেতকীর আগমন দৃশ্যে হঠাত্ করে তার অমিতকে আংটি ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি একটু খাপছাড়া লেগেছে। কেতকীকে আরো একটু বর্ণনা করার প্রয়োজন বোধ করেছি। নাটকটিতে নূনা আফরোজ, অনন্ত হিরা, রামিজ রাজু ছাড়াও অভিনয় করেছেন আউয়াল রেজা, সরোয়ার আলম সৈকত, মাইনুল তাওহীদ, শুভেচ্ছা, ইস্টের সুমী, মিথিলা, রিয়া, জাহিদ, রিগ্যান, মনির, সীমান্ত, বিপ্লব, আশা ও চৈতালী প্রমুখ।