নোবেল পুরস্কার প্রদানকারী সুইডিস একাডেমির স্থায়ী সচিব পিটার অ্যাঙ্গল্যান্ড মার্কেসের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘একজন মহত্ সাহিত্যকর্মী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর রচনা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। কারণ অধিকাংশ লেখকই শুধু ছায়া। আর গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস হচ্ছে সেই লেখক, যিনি ছায়া সৃষ্টি করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর প্রভাব সাহিত্য জগতে অম্লান।’ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার নিপুণ শিল্পী। সাহিত্যমানের দিক থেকে তাঁর রচনাকে আর্নেস্তা হেমিংওয়ে, তলস্তয়, চালর্স ডিকেন্স’-এর সাথে তুলনা করা হয়। এ কারণে তাঁর উপন্যাস ও গল্পে কখনো প্রচণ্ড ঝড় বছরের পর বছর বয়ে যায়, কখনো আকাশ থেকে ফুল ঝরে, কখনো স্বৈরশাসক যুগের পর যুগ জীবিত থাকে, কখনো আধ্যাত্মিক সাধকরা আকাশে উড়ে চলে, আবার মৃতদেহরা কবর থেকে উঠে আসে। জাদুবাস্তবতায় যৌক্তিক পারম্পর্যতায় অর্ধশতাব্দির বিচ্ছেদ সত্ত্বেও প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা অম্লান থাকে। এ জাদুবাস্তবতা লাতিন আমেরিকার নির্মম স্বৈরাচারী শাসকের শাসন, বিদ্রোহ, দুর্ভিক্ষ ও গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট থেকে সংগৃহীত।
গাবো বাল্যকাল নানাবাড়িতে কাটিয়েছেন। নানাবাড়ির প্রকৃতিই তাঁর সাহিত্যকর্মকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘নানির গল্পের অনেক ভূতপ্রেতের কাহিনি আমার লেখায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে’। নানা নিকোলাস সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’-এ কর্নেল বুয়েন্দার চরিত্র তাঁর নানার চরিত্রেরই রূপান্তর মাত্র। আর যে প্রাগৈতিহাসিক গ্রামের চিত্র বর্ণনা করেছন, তা তাঁর নানাবাড়ির গ্রাম ‘অ্যারাকাতাকা’র। কৈশোরে গাবো ‘বগোতা’য় আইন অধ্যয়ন করতে যান। কিন্তু কোনো ডিগ্রি লাভের পূর্বে সাংবাদিকতায় নাম লেখান। থাকতেন এক পতিতালয়ের ওপর ভাড়া নেওয়া চিলেকোঠায়। আর এখানে থাকা অবস্থায়ই সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘জীবন তখন ছিল সম্পূর্ণ বহিমিয়ান। রাত ১টার মধ্যে পত্রিকার সকল কাজ শেষ করা, তারপর গল্প ও কবিতা লেখা রাত ৩টা পর্যন্ত, আর অবশেষে বারে গিয়ে শান্তি খুঁজে ফেরা’। বিশ্বসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। তাই চালর্স ডিকেন্স, তলস্তয়, প্রাউস্ট, কাফকা আর ভার্জিনিয়া ওলফ সবাইকে তিনি পড়েছেন মনোযোগসহকারে। তিনি বলতেন, ‘ভাবতে পারি না—কীভাবে একজন মানুষ উপন্যাস লিখতে বসে পূর্বের ১০০০ বছরের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম পাঠ না করে।’ এর অর্থ কিন্তু কারও অনুকরণ নয়; বরং অন্য থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া।
১৯৫৭ সালে গাবো সংবাদপত্রের চাকরি হারান। এসময় তিনি ‘ইন এভিল আওয়ার’, ‘নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল’ দু’টি উপন্যাস রচনা করেন। এই ‘নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল’ তাঁর নানার আত্মজীবনী। নানার মতো এ উপন্যাসের কর্নেলও চাকরি থেকে অবসরের পর; পেনশন পেতে একের পর এক চিঠি পাঠাত, কিন্তু কখনো চিঠির উত্তর পেত না। এ উপন্যাসে হূদয়বিদারক বাস্তবতার শৈল্পিক রূপায়ন ঘটে। ১৯৬১ সালে তিনি ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সামরিক আন্দোলনের পক্ষে ‘পারসেনা ল্যাতিনা’য় নিয়মিত কলাম লেখতে থাকেন। ১৯৬১-১৯৬৫ সালে অবসর জীবন কাটান। বাড়ি ফিরে তিনি প্রায় আঠার মাস যাবত বিরতিহীনভাবে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ লিখতে থাকেন। এসময় পরিবার অনেকটা আর্থিক অনটনে পড়ে। সেই অনটনের মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমি যখন লেখা শেষ করলাম, আমার স্ত্রী আমাকে প্রশ্ন করল, ‘সত্যিই তুমি কি লেখা শেষ করেছো? জানো তো—আমাদের মোট দেনা ১২,০০০ ডলার।’ এই বই প্রকাশ পাওয়ার সাথে-সাথে সকল অর্থসংকট থেকে মুক্তি পায় গাবো। এ উপন্যাস কয়েকদিনেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। অসংখ্য উত্থান-পতনের পর তাঁর পরিবার এই প্রথম সুখের মুখ দেখে। খ্যতনামা কবি পাবলো নেরুদা বলেন, ‘স্প্যানিশ সাহিত্যের ইতিহাসে এ উপন্যাস সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব’। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক উইলিয়াম কেনেডি বলেন, ‘পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাস শুরুর পর থেকে এটি একমাত্র উপন্যাস, যা প্রত্যেক যুগের প্রত্যেক প্রজন্মের পাঠ আবশ্যক’। প্রশংসার স্রোতে তাঁর এই সাহিত্যকর্ম অসংখ্যবার ভেসেছে। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ম্যাকান্দো শহরের এক পরিবারকে নিয়ে। এ শহরে বুয়েন্দা নামের এক দেশপ্রেমিক পরিবার উপনিবেশ গড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পরিবারের বংশধররা সফলতার আশা করে, কিন্তু তারা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় দৈবিক কারণে। কখনো তারা প্রেমে পড়ে, স্বপ্ন দেখে ধনী হওয়ার, যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, কিন্তু সফল হতে পারে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভৌতিকভাবে তাদের প্রতিরোধ করে। বৃষ্টি, প্লেগ রোগ কখনো তাদের স্মৃতিভ্রষ্ট করে। এটি রেশমের পর্দার মতো প্রামাণিক উপন্যাস, যাতে বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলন ঘটেছে। এক হয়ে গেছে সমসাময়িক রাজনীতি ও ইতিহাস। এ কারণে ১৯৭০ সালে নিউ ইর্য়ক টাইমসে সমালোচক জর্জ রাবাসা বলেন, ‘এ উপন্যাস জাদুর হাতে রচিত। যাতে স্মৃতি-ভবিষ্যত্কথন, কল্পনা-বাস্তবতা মিলেমিশে একাকার। এটা মার্কেসের মতোই আশ্চর্যজনক উপন্যাস।’ প্রকাশিত হওয়ার পর এর প্রায় ত্রিশ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়। তারপর থেকে এটি একের পর পুরস্কার জয় করতে থাকে ইতালি, ফ্রান্স, ভেনিজুয়েলাসহ বিশ্বের সর্বত্র। আর ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়। তিনি নিজেও একসময় ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’-এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এমনকি কোনো কোনো সাক্ষাত্কারে এর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি ভয় পেতেন এই মহত্ সাহিত্যকর্মের কারণে পাঠকের দৃষ্টি তাঁর অন্যান্য রচনার প্রতি না পড়ে। কিন্তু বিচলিত না হলেও পারতেন। কারণ, তাঁর অনান্য সাহিত্যকর্ম—১৫টি উপন্যাস ও ছোটগল্পের বই সমালোচক ও পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। গাবো কখনোই দাবি করেননি—এই উপন্যাসে জাদুবাস্তবতা আবিষ্কার করেছেন। তাঁর মতে, এই উপাদান লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে অনেক আগেই ছিল। হ্যাঁ; তবে তাঁর পূর্বে এতটা শৈল্পিক ও প্রাণবন্তভাবে কেউ লাতিন সাহিত্যে এর ব্যবহার করেনি।
১৯৭৩ সালে চিলির স্বৈরশাসক জেনারেল পিনোচেত সমাজতান্ত্রিক দলের রাষ্ট্রপতি ‘সালভেদর অ্যালোন্দাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। হতাশ হয়ে গাবো লেখালেখি ছেড়ে দেওয়ার মনস্থ করেন। কিন্ত বছর শেষে বুঝতে পারেন—কলম বন্ধ করা মানে স্বৈরশাসকের কাছে নতি স্বীকার করা। তাই আবার তার কলম ফুঁসে ওঠে। আর ১৯৭৫ সালে দ্বিতীয় উপন্যাস লেখেন, ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। এ উপন্যাসে লাতিন আমেরিকার এক স্বৈরশাসকের কাহিনির অবতারণা করেন। যে স্বৈরশাসক ভূতের মতো দশকের পর দশক শোষণ করেন। তাঁর মতে, এ উপন্যাস ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক রচনা। প্রকাশিত হওয়ার অল্পকদিনে এ বইটিও সর্বাধিক বিক্রির রেকর্ড গড়ে। এরপর ১৯৮১ সালে ‘ক্রনিকাল অব অ্যা ডেথ ফোরটোল্ড’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এতে সাংবাদিকদের মতো গল্প বলার ঢঙে তিনি কাহিনি রূপায়ণের চেষ্টা করেন। এখানে গল্পের নায়ক সান্তিয়াগো নাছার বোনের ধর্ষককে খুন করে পরিবারের সম্মান বাঁচানের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; সে বাধ্য হয় দুর্ভাগ্যের নিকট পরাজয় বরণ করতে।
তিনি যে শুধু ট্রাজেডিধর্মী উপন্যাস রচনা করেছেনে, তা কিন্তু নয়। প্রেমের উপন্যাস রচনায় তাঁর দক্ষ হাতের প্রমাণ—উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। এ অনন্য আবেগঘন উপন্যাসে ৭৯ বছর বয়স্কা এক রমণী পঞ্চাশ বছর পূর্বের প্রেমিকের প্রতি সতেজ ভালোবাসা অনুভব করে। হলিউডের চলচ্চিত্র পরিচালক ‘মাইক নিউলেক’ এ উপন্যাস নিয়ে ২০০৭ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রটি ৪.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে সক্ষম হয়। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করলেও আমেরিকান মিডিয়ায় এর যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর ছোটগল্প ‘ক্রনিকাল ডেথ অব ফোরটোল্ড’ নিয়ে নাটক নির্মাণ করেন ইতালির চলচ্চিত্রকার ফ্যান্সিসকো রোসি। যা কান চলচ্চিত্র উত্সবে মুক্তি পায়। তাঁর সর্বশেষ আলোচিত উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিনথ’ ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসে সিমন বলিভারের শেষ-জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি এই উপন্যাসে বলিভারকে লাতিন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
লাতিন আমেরিকার প্রায় প্রত্যেক দেশেই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। ম্যাক্সিকো সিটি, বার্সেলোনা, প্যারিস, ক্যার্তেজান, কলম্বিয়া ও ক্যারিবিয়ান উপকূলে নিজের বাড়ি রয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনো জন্মভূমি আরাকাতাকার স্মৃতি ভুলতে পারব না। কারণ, এই আরাকাতাকা গ্রামে একদিন আমাকে ফিরতে হবে। সেদিন আবিষ্কার করব আমার নস্টালজিয়া ও বাস্তবতাই হলো সাহিত্যকর্মের মূল উপাদান’। সাদা শার্ট, সাদা জুতো ও সাদা হাতঘড়ি পরিহিত উষ্কখুষ্ক গোঁফের অধিকারী গাবো। কৈশোরে বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সবচেয়ে অদম্য। আর পরিণতে বয়সে বামদলের একনিষ্ঠ সমর্থক। তাই একসময় আমেরিকাও তাঁকে ভ্রমণভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানাত। কারণ, তিনি কলম্বিয়া কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বন্ধু। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের শাসনকালে তাঁর প্রতি ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। কারণ, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও তাঁর একান্ত ভক্ত পাঠক। ক্লিনটন ‘ইয়েল ল স্কুল’-এর ছাত্রাবস্থায় প্রথম ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ পাঠ করেন। আর গাবোর ভক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ক্লিনটনের আমন্ত্রণে কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। মার্কেস-এর মৃত্যুতে শোক বার্তায় ক্লিনটন বলেন, ‘গাবোর মৃত্যুর সংবাদে আমি শোকাহত। আজ থেকে ৪০ বছর আগে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ পড়ে অবাক হই। বুঝতে পারি তাঁর কল্পনাশক্তি, চিন্তার স্বচ্ছতা ও আবেগের সততা কত গভীর। তিনি আমাদের মানবিক জীবনের দুঃখ ও আনন্দকে জাদু ও বাস্তবতার সমন্বয়ে উপস্থাপন করেছেন। আমি তাঁর বন্ধু হতে পেরে গর্বিত।’
শুধু কি তাই; কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান মেনুয়েল স্যান্তোস রাষ্ট্রীয় তিনদিনের শোকদিবস ঘোষণা করেছেন। টেলিভিশনে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘মহানায়করা কখনো মরে না’। তাঁর মৃত্যুতে পৃথিবী শোকাহত। শোকের বাতাসে ভারাক্রান্ত শিল্প-সাহিত্যের জগত্। ম্যাক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, ‘আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পৌরাণিক মহানায়ক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর মৃত্যুতে আমিও শোকাহত’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এক শোকবার্তায় জানান, ‘এ পৃথিবী তাঁর সবচেয়ে স্বপ্নবিলাসী একজন লেখককে হারাল’। সত্যি জাদুবাস্তবতার প্রাণপুরুষ এ পৃথিবী ত্যাগ করছেন, কিন্তু তাঁর হূদয়ছোঁয়া লেখা পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকবে আজীবন।
