জুমিয়া পরিবারের লাগানো জুমের আগুনে জ্বলছে বান্দরবানে পাহাড়ের জীব-বৈচিত্র্য। সবুজ পাহাড়গুলো হয়ে পড়ছে বৃক্ষশূন্য, ন্যাড়া। আদি পদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পার্বত্যাঞ্চলের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি।
জুমের আগুনে শুধু পাহাড়ের গাছপালা, জীব-বৈচিত্র্যই নয়, স্থানীয় পাহাড়ী জুমিয়াদের ঘরবাড়ি এবং মানুষ পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিগত দশ বছরে জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানছিসহ সাত উপজেলায় আগুনে পুড়ে মারা গেছে কমপক্ষে ১৫ জন মানুষ।
গতকাল বুধবারও ট্যুরিজম স্পট নীলগিরি-চিম্বুক ও নীলাচলসহ আশপাশের সড়কগুলোতে আদি পদ্ধতিতে জুম চাষের জন্য অনেক পাহাড় আগুনে পোড়াতে দেখা গেছে। বছরের পর বছর পাহাড়ে আগুন দিয়ে জুম চাষের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীজ সম্পদ। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে আগুন দিয়ে আদি পদ্ধতিতে জুম চাষ করে সারা বছরের খাদ্যশস্য ঘরে তুলতে পারলেও জুম চাষ প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিপন্ন করার পাশাপাশি মাটি ক্ষয় এবং প্রাণীজ সম্পদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে দেয়। একারণে পাহাড়ে পরিবেশসম্মতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এবারও বান্দরবানে সর্বাধিক জমিতে জুম চাষের প্রস্তুতি নিয়েছে পাহাড়ীরা। জেলায় প্রায় ১১ হাজারের অধিক হেক্টর পাহাড়ী জমিতে জুম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা সদরের ডলুপাড়া, গেজমনি পাড়া, শৈলপ্রপাত, যৌথখামার এলাকা, কানাপাড়া, মেঘলা, মাঝেরপাড়া, আমতলীপাড়া, সাতকমলপাড়া, ফারুকপাড়া, বান্দরবান-চিম্বুক, বান্দরবান-রোয়াংছড়ি, বান্দরবান-রুমা-থানছি সড়কসহ জেলার সাত উপজেলায় শতশত পাহাড়ে জুম চাষের প্রস্তুতি নিয়েছে জুমিয়ারা।
আদি পদ্ধতিতে জুমচাষের জন্য সবুজ-শ্যামল পাহাড়গুলোর ঝাড়-জঙ্গল, গাছপালা কেটে নির্বিচারে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পাহাড়গুলো ন্যাড়া করে জুম চাষের উপযোগী করা হচ্ছে।
মূলত বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুমিয়ারা পাহাড়ে আগুন দেয় এবং মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ শুরু করে। চিম্বুক সড়কের পাহাড়ের বাসিন্দা লিংরিয়ান মুরুং এবং ডলুপাড়ার বাসিন্দা চথোয়াই মারমাসহ কয়েকজন জুম চাষি জানান, পাহাড়ে জুম চাষ তাদের পূর্বপুরুষের আদি পেশা। তারা জুম চাষের মাধ্যমে সংসার চালায় এবং সারাবছরের খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করে। জুমে পাহাড়ী ধান, ভুট্টা, মরিচ, যব-সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, মারমা, টকপাতা এবং আদাসহ বিভিন্ন রকম মসলা ও সবজি চাষ করে। জুম চাষের মাধ্যমে অধিকাংশ দরিদ্র পাহাড়ী জীবিকা নির্বাহ করে। বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও শষ্য উত্পাদন বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ আলতাফ হোসেন জানান, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর জুম চাষ। পাহাড়ে জুমিয়া পরিবারের লাগানো আগুনে জীব-বৈচিত্র্য হারাচ্ছে পাহাড়গুলো। পাহাড়ের সবুজ গাছপালা এবং বন্যপ্রাণী মরে যাচ্ছে। মাটি ক্ষয় হয়ে অল্প বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের সৃষ্টি হচ্ছে। সবুজ পাহাড়গুলো ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হচ্ছে। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে গাছপালা, বন্যপ্রাণী এবং পাহাড় ধস উভয় রোধকরা সম্ভব হবে। জুম চাষে আরো অধিক ফলনও সম্ভব। পাহাড়ী গবেষক সিংইয়ং ম্রো বলেন, জুম চাষ আগের তুলনায় অনেক কমেছে। যুগ যুগ ধরে পাহাড়ী সম্প্রদায়রা জুম চাষ করে আসলেও ইদানীং মিশ্র ফল চাষের দিকে ঝুঁকছে তারা। অবহেলার শিকার ম্রো জনগোষ্ঠী এখনো সম্পূর্ণ জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে জুম চাষের প্রবণতা অনেকাংশে কমে গেছে।
