মিথ্যা রোগ দেখিয়ে বিদেশগামীদের সঙ্গে প্রতারণা

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১৬
বিদেশগামীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে এক শ্রেণির মেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার দীর্ঘদিন প্রতারণা করে আসছে। গতকাল বনানীতে এ ধরনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে জেল-জরিমানা করে মোবাইল কোর্ট প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেয়। বিভিন্ন জনশক্তি রপ্তানির অফিস থেকে বিদেশে চাকরি করতে ইচ্ছুক শ্রমিকদের ঐ সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পাঠায়। বেশিরভাগ অসহায় বিদেশগামীদের শারীরিক অযোগ্য (আনফিট) বলে জানায় চিকিত্সা নিতে হবে কিংবা জটিল রোগ ধরা পড়েছে, বিদেশ যাওয়া সম্ভব নয়। এসব কথা নিরীহ বিদেশগামী লোকটি শুনে হতাশ হয়ে যায়। সহায় সম্বল ও জায়গা জমি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশে আদম বেপারীকে কয়েক লাখ টাকা লোকজন স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগে দিয়ে থাকেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী শারীরিক অযোগ্য লোকটিকে শারীরিক যোগ্য (ফিট) করে দেবে। এ জন্য নিম্নে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। এভাবে প্রতারণা করে প্রায় প্রতি বিদেশগামী ব্যক্তির কাছ থেকে দীর্ঘদিন গুলশান ও বনানীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা মেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঐ সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেশির ভাগেরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোন অনুমোদন নেই। ঐ সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা নিরীক্ষার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। সারাক্ষণ ডাক্তার থাকার কথা থাকলে কোন ডাক্তার নেই। কোন ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিজেরাই ডাক্তারের স্বাক্ষর দিয়ে থাকে। গতকাল র্যাব-১-এর পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট বনানী ১০ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ির তিন তলায় স্টার কিউর মেডিক্যাল সেন্টারে অভিযান চালায়। ঐ সময় সংগ্রহীত রক্ত মলমূত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট ও ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদান করা হচ্ছিল। আল আমিন, শরিফুল আলম ও আহম্মেদ আলী নামে তিন ব্যক্তির ফিটনেস সার্টিফিকেট তৈরিকালে মেডিক্যাল সেন্টারের ম্যানেজার মনিরুজ্জামানকে হাতেনাতে আটক করে মোবাইল কোর্ট। ফিটনেস কার্ডে চক্ষু, শ্রবণ ক্ষমতা, হূদযন্ত্র, মলমূত্র, রক্ত, ইসিজি ও এক্সরেসহ ৩৫টি টেস্টের রিপোর্ট দেয় ঐ মেডিক্যাল সেন্টারের ম্যানেজার ও কর্মচারীরা। মালিক আবুল বাশার মোবাইল কোর্টকে জানান, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রতি বিদেশগামী ব্যক্তির কাছ থেকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি নেয়। আর তাকে জনপ্রতি মাত্র আড়াইশ থেকে ৪শ টাকা দেয়া হয়ে থাকে। এ টাকার মধ্যে কোন ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব নয় বলে মালিক মোবাইল কোর্টকে জানান। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও তিন বছর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবসা করতে করতে সবই শিখে গেছেন বলে মোবাইল কোর্টকে জানিয়েছে মালিক। মোবাইল কোর্ট মেডিক্যাল সেন্টারের মালিক আবুল বাশারকে ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। ম্যানেজার মনিরুজ্জামাকে একই কারাদণ্ড দেয়া হয়। রক্ত সংগ্রহকারী কর্মচারী মাহফুজা ইসলাম রেনুকে এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ড, রুনা খানম ও বিবি খাদিজাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাস কারাদণ্ড দেয় মোবাইল কোর্ট। এ তিন তরুণী বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে বিদেশগামীদের বাগিয়ে আনার জন্য প্রতিষ্ঠান মালিকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। উক্ত মোবাইল কোর্টে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিনিধি ড. যোগেশ চন্দ্র রায় উপস্থিত ছিলেন। দুই ভুয়া মহিলা দন্ত চিকিত্সকের কারাদণ্ড গত বুধবার রাতে র্যাব-২ এর পরিচালনায় একই মোবাইল কোর্ট কাঁঠালবাগান ১৯ নম্বর নাসির কমপ্লেক্সে হ্যাভেন ডেন্টাল কেয়ারে অভিযান চালিয়ে দুই ভুয়া মহিলা দন্ত চিকিত্সক শিউলি আক্তার (৩৫) ও কান্তা সরকারকে (২৭) চিকিত্সা প্রদানকালে আটক করে। শিউলি মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন এবং এক সময় এক দন্ত চিকিত্সকের চেম্বারে কিছু দিন কাজ করেছিলেন। এরপর তিনি নিজে কাঁঠালবাগানে চেম্বারে দাঁতের সব ধরনের চিকিত্সা দিয়ে আসছেন। তার সহযোগী কান্তা সরকারের তেমন লেখাপড়া নেই। মোবাইল কোর্ট শিউলি আক্তারকে এক বছর কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। কান্তা সরকারকে ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেয় মোবাইল কোর্ট।