রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছর পার হলেও ওই দুর্ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজ থাকা গার্মেন্টকর্মীদের স্বজনদের কান্না আজও থামেনি। নাড়ি ছেঁড়া ধন সন্তানের ছবি বুকে জড়িয়ে কবরের কাছে গিয়ে প্রতিদিন দুখিনী মায়ের কান্না-বিলাপ কবে শেষ হবে কেউ জানে না! হয়ত আমৃত্যু এই দু:সহ শোক আর কষ্টের কান্নার ভার বইতে হবে হতভাগ্য স্বজনদের।
বড়াইগ্রাম (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার নিহত পাঁচ শ্রমিকের একজন উপজেলার খাকশা গ্রামের মতিউর রহমান মতিন (২৭)। ইট-পাথরের নীচে চাপা পড়েছে তার ভালোবাসা আর সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন। মা-হারা মতিনের শোকে এখনো পাগলপ্রায় তাকে লালন-পালন করে বড় করে তোলা খালা সূর্য বেগম। মতিনের মৃত্যুর পর কোন অনুদান পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে সূর্য বেগম বলে উঠেন, ‘টাকার জন্য তো ছেলে মানুষ করিছিনুনি। ছ্যালিডা বাঁচি থাকলে হয়তো আমাদের বৃদ্ধ বয়সে একটু উপকারে আসতো। তা হলি না।’
স্বামী হযরত আলীকে (৩৫) হারিয়ে একমাত্র প্রতিবন্ধী সন্তান রাহুলকে (৬) নিয়ে দুঃখ-কষ্টে দিন কাটছে একই উপজেলার রাবেয়া বেগমের। শত কষ্টের মাঝেও সন্তানকে স্থানীয় একটি ব্র্যাক স্কুলে ভর্তি করেছেন। কেমন আছেন- জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাবেয়া বলেন, ‘যন্ত্রের মত বেঁচে আছি। ওর আব্বা আমাকে ওকে মানুষ করার সব দায়িত্ব চাপিয়ে চলে গেছেন। আমি সেই কাজটা করছি। দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এক লাখ এবং প্রবাসী কল্যাণ তহবিল থেকে ৫০ হাজার টাকা পাইছি। সামান্য এই টাকা দিয়ে কদিন বাঁচা যায় বলেন?’
চণ্ডিপুর গ্রামের আলেয়া বেগম (৪৫) ও তার মেয়ে মৌসুমী খাতুন (২০) এক সঙ্গে মারা যান। পড়ালেখা ছেড়ে শহরে দর্জির কাজ করছেন ছেলে আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘মনের দুঃখে ভিটেমাটিতে যাই না। খালি মা-বোনের কথা মনে পড়ে। তাই কাজের মধ্যে থ্যাকি মনডা ভাল রাখার চেষ্টা করি।’
উপজেলার মাঝগাঁওয়ের তাইজউদ্দিনের মেয়ে দোল নাহার বেগম (৩৮)। একমাত্র মেয়ে নাজমীরাকে (১১) মানুষ করার স্বপ্নে গার্মেন্টের কাজটি আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলেন সংসারত্যাগী এই নারী; কিন্তু রানা প্লাজা তার সব স্বপ্নকে ধুলিসাত্ করে দিয়েছে। বাবা থেকেও নেই, আর মাকে হারিয়ে এখন শিশু নাজমীরার কষ্টের দিন যেন কাটে না। বৃদ্ধ নানার আশ্রয়ে বর্তমানে খেয়ে না খেয়ে চলে তার দিন।
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ওই দুর্ঘটনায় মানিকগঞ্জের নিহত ৮ পরিবারের বাড়িতে শোকের মাতম এখনো থামেনি। ঘিওর এলাকার মজলিশ মল্লিকের স্ত্রী আলেয়া বেগমের (৩০) তিন বছরের ছেলে এখনো খুঁজে বেড়ায় তার মাকে। হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউপির কচুয়া গ্রামের বাচ্চু কাজীর মেয়ে চায়না (২১) আক্তারের মৃত্যু শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তার পরিবার। একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়েকে হারিয়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতার দিন কাটছে অর্থ কষ্টে।
ওই ঘটনায় মারাত্মক আহত মানিকগঞ্জের দিঘুলিয়া গ্রামের তিহান মিয়ার চোখে এখনো ভেসে উঠে সেদিনের সেই ঘটনার ভয়াবহতা। কিছুতেই ঘুমাতে পারে না সে, দুই চোখের পাতা এক করলেই ভয়ে চিত্কার করে উঠে। একই ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে এখন বিছানায় দিন কাটে বরাইদ গ্রামের আবদুর রশিদের পুত্র রানার।
বানারীপাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, ওই ঘটনায় নিহত উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের শিয়ালকাঠি গ্রামের সুজন মোল্লা ও চাখারের দড়িকর গ্রামের রিয়াজের স্ত্রী পপির স্বজনদের কান্না আজও থামেনি। দুই জনের পরিবারেই এখন চরম দৈন্যতা নেমে এসেছে। সরকারের কাছ থেকে পাওয়া কিছু আর্থিক সহায়তায় দীনহীন ভাবে চলছে পরিবার দুইটি।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, ওই ট্রাজেডির পর থেকেই রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির গার্মেন্টকর্মী এরিনা খাতুন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আজও এরিনার পথ চেয়ে বসে আছে ৮ বছর বয়সী ইমন মোল্লা ও ৪ বছর বয়সী রিমন মোল্লা নামে তার দুই অবুঝ শিশু সন্তান। তাদের ভাগ্যে জোটেনি কোন প্রকার সরকারি সহযোগিতা। এখন কোন মত খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।
এরিনা বেগমের শাশুড়ী মাজেদা বেগম জানান, ‘শিশু দুইটির চোখে-মুখে মায়ের অভাব, রাতে বার বার মা মা বলে চিত্কার দিয়ে ওঠে। তোমার মা আসছে- বলে শান্ত করে রাখতে হয়। এভাবেই গত এক বছর ধরে আশ্বাস দিয়ে আসছি। সরকার কত মানুষরে কত টাহা দিল আমরা কিছুই পালাম না।’
