রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নিহত শ্রমিকদের জন্য দোয়া ও স্মরণসভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্য আর আহত শ্রমিকরা তাদের দুঃখ-কষ্ট আর ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার রাজনীতিবিদ ও মালিকদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের (শ্রমিক) জীবন নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলবেন না। পোশাকের দাম না বাড়ানোয় বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সমালোচনা করে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বিদেশি ক্রেতারা মজুরি বাড়াতে বলেছিলেন। মজুরি বাড়ল। কিন্তু তারা পোশাকের দাম না বাড়িয়ে উল্টো কমিয়ে দিলেন। রানা প্লাজার মত দুর্ঘটনার জন্য তারাও দায়ী।
সংগঠনের সভাপতি আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিজিএমইএ ভবনে অনুষ্ঠিত এ স্মরণসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
স্মরণসভায় রানা প্লাজার নিউ ওয়েভ স্টাইল গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করা শ্রমিক সাথী আক্তার দুর্ঘটনার পর তার উদ্ধার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে চাই। ওই ভবনের শ্রমিক সাহীনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ে মারা যান উদ্ধারকর্মী কায়কোবাদ। স্মরণসভায় উপস্থিত হয়ে তার বোন নুরুন্নাহার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের কারণে আমার ভাইকে হারিয়েছি; তাদের কোনদিন ক্ষমা করব না।
উদ্ধারকর্মী খোয়াজ আলী উদ্ধার কর্মীদের কষ্টের কথা তুলে ধরে তাদের জন্য সহায়তা দাবি করেন। তিনি বলেন, কয়েকজন উদ্ধারকর্মী পাগল হয়ে গেছেন। তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। তাদের সহায়তা করুন।
নিহতদের পরিবারের ১৫টি এতিম শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব পালন করছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে সাভারের আঞ্জুমানে আজিজুল ইসলাম এতিমখানা। গতকাল অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় ওই শিশুরা। নিহত এক শ্রমিকের শিশুকন্য আলিফা খাতুন জানায়, তার মা রানা প্লাজার চার তলায় কাজ করত। তারা দুই বোন। বাবা অসুস্থ। তাদের মা মারা যাওয়ার পর কোনরকমে দিন কাটাত। এখন সে ওই এতিমখানার তত্ত্বাবধানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। এই শিশু তার মা’কে নিয়ে একটি কবিতা পড়ে শোনালে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এছাড়া অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামস্থ ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট একাডেমিতে (ওরকা হোমস) অধ্যয়নরত ১৪টি এতিম শিশু মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করে। তারা একসঙ্গে গেয়ে শোনায় ‘আমরা করব জয় একদিন....।’
স্মরণসভায় তোফায়েল আহমেদ রানা প্লাজার ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আর যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য মালিকপক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রানা প্লাজার পর আর কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে এই খাত নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত হচ্ছে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এ ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করব। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় নেতিবাচক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই প্রতিবেদনের অভিযোগ মোটেই সত্য নয়। বিজিএমইএ’র কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে দেশের ইমেজ ক্ষু্ণ্ন্ন হয় এমন সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যম কর্মীদের বিরত থাকারও আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম তিনশ’ এতিম শিশুর দায়িত্ব নেয়ার কথা জানিয়ে আহত শ্রমিক ও নিহতদের এতিম সন্তানের বিষয়ে খোঁজ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউ যাতে দাবি না করতে পারে আমরা কিছু করিনি।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, আমাদের কারণে যাতে আর একটি প্রাণও না ঝরে এ প্রতিজ্ঞা করলাম। এ খাতের সংস্কারে নেয়া উদ্যোগ যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন হয় সে ব্যবস্থা করা হবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রোকেয়া এ রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রী সামসুল হক টুকু, বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান, বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদ, বিজিএমইএ সহ-সভাপতি এসএম মান্নান কচি প্রমুখ।
এর আগে বিজিএমইএ সকালে শোক শোভাযাত্রা ও পরে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। মোনাজাত পরিচালনা করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব অধ্যাপক মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। এসময় বাণিজ্যমন্ত্রী ছাড়াও শিল্প মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নুসহ পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
