‘আমরা অসহায়- কেউ সন্তান হারা, কেউ স্বামী হারা, কেউ ভাই হারা, কেউ পিতা হারা। গত পাঁচ মাস ধরে আমাদের কারো প্রিয় সন্তান, কারো পিতা, কারো স্বামী নিখোঁজ রয়েছেন। গত ৪ ডিসেম্বরের পর থেকে পৃথক পৃথক সময়ে ‘র্যাব বা ডিবি’ পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু র্যাব বা ডিবির পক্ষ থেকে বরাবরই তা অস্বীকার করা হয়েছে। র্যাবের দপ্তর এবং বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি।’ সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া ৮ জনের পরিবারের সদস্যরা গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে এমন অভিযোগ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে তাদেরকে ‘গুম’ করার অভিযোগ করে, পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার আহবান জানানো হয়। ব্রিফিংয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল, আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরি উপস্থিত ছিলেন। আর সাংবাদিক সম্মেলন সঞ্চালনের দায়িত্বে ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার সমিতির কর্মকর্তা মঞ্জুর হোসেন ইশা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের ৪ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন সময়ে তেজগাঁও থানার শাহীনবাগের বাসিন্দা ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম সুমন (৩৪) ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রসহ আটজনকে র্যাব ও ডিবি পরিচয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। এরা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। অক্ষত অবস্থায় তাদেরকে ফিরে পেতে চান তারা। নিখোঁজ হওয়া বাকি সাতজন হলেন, বিএনপি নেতা সাজিদুল সুমনের খালাত ভাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল করিম তানভীর (৩০), শাহীনবাগের বাসিন্দা কাওসার আহমেদ (২৪), পূর্ব নাখালপাড়ার আবদুল কাদের ভূঁইয়া মাসুম (২৪), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম রাসেল (২৪), মুগদা এলাকার আসাদুজ্জামান (২৭), উত্তর বাড্ডার আল আমীন (২৬) ও শাহীনবাগের এ এম আদনান চৌধুরী (২৮)। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুমনের মা হাজেরা খাতুন, রাসেলের মা মজিদা বেগম, আল আমিনের মা জেসমিন বেগম, তানভীরের মা নিলুফা বেগম, রানার মা আয়েশা খাতুন, আদনানের মা কানিস, সুমনের স্ত্রী নাসিমা আক্তারসহ পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালে আশিকুর রহমান নামে আরেকজনের পিতা আব্দুল লতিফ সেখানে হাজির হয়ে সাংবাদিকদের জানান, তার ছেলে আশিকুর রহমানকে গত ২৭ মার্চ রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। স্থানীয় এমপি ও এক মন্ত্রীকে সুপারিশ করেও আশিকুরকে উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু গত ২৭ দিন ধরে তার ছেলেকে উদ্বার করা সম্ভব হয়নি। তিনি অবিলম্বে ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেয়ার দাবি জানান।
সুলতানা কামাল বলেন, ‘নিখোঁজদের উদ্ধারের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ ধরনের অনাচার-অবিচার চলতে পারে না। প্রত্যেকের দায়িত্ব এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’ নিখোঁজদের উদ্ধারের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিতে হবে।
আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘এই কান্নার জন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক হয় তাহলে জনগণের কথা শুনতে হবে।’ ক্রসফায়ারের কোন ঘটনায় আজও বিচার হয়নি দাবি করে এই আইনজীবী বলেন, ‘বিচারহীনতার পথ ধরে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।’
গুম প্রতিরোধে ভারতের মনিপুর রাজ্যের উদাহরণ টেনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, এ ধরনের ক্রসফায়ার ও নিখোঁজ হওয়ার যে ঘটনা তা প্রতিরোধ করতে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ সেল করতে হবে।
পরিবারের অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে নিখোঁজদের পরিবার জানায়, গত ৪ ডিসেম্বর চার বন্ধু মাজহারুল ইসলাম রাসেল, আল আমিন, আসাদুজ্জামান রানা, আব্দুল কাদের ভুঁইয়া মাসুম বসুন্ধরা এলাকায় বেড়াতে গেলে সন্ধ্যার পর র্যাবের চারটি গাড়ি (র্যাব-১ লেখা) আই ব্লক থেকে টেনে হেঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর কিছুদূর গিয়ে যুবদল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন ও তার খালাত ভাই তানভীরকে গাড়িতে উঠায়।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, রাসেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ছিলেন। এছাড়া রানা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন এবং মাসুম তিতুমীর কলেজের ছাত্র ছিল। তাদের নামে থানায় মামলা ছিল না। অনেক খোঁজ করে তাদের সন্ধ্যান মেলেনি। পরিবারের দাবি, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত তাদের কোন সন্ধানই দিতে পারেনি। র্যাব-১সহ র্যাবের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এ বিষয়ে কোন সুরাহা পাননি তারা।
