সময়ের সঙ্গে আমাদের জীবনে যোগ হয়েছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। ওইসব প্রযুক্তিরও ব্যবহার ও ক্ষেত্র বেড়েছে অনেক। ফলে বদলে গেছে জীবনযাত্রার মান। একসময়ে যা ছিল কল্পনা, এখন তা বাস্তব। কত কম সময়ে সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা যায় তার প্রতিযোগিতা এখন বিশ্বব্যাপী
টাকা। জীবন চালাতে, জীবন রাঙাতে এর কোন বিকল্প নেই। প্রতিটি মুহূর্তেই দরকার। তবে এই টাকা কখনই কারো কাছে স্থির থাকে না। সময় ও প্রয়োজনের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাতবদল হওয়াই যেন তার ধর্ম। এক হাত থেকে একহাতে ঘুরছে, তৈরি করছে হাসি-কান্নার ইতিহাস। তবে টাকার গায়ে এ হাসি-কান্নার কোন স্পর্শই যেন লাগে না। এই হাসি-কান্নার ইতিহাস তৈরির জন্য কখনও কখনও নিকট আত্মীয় বা ব্যবসায়িক সহযোগীর কাছে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। হোক তা দেশের ভিতরে কিংবা দেশান্তরের কোথাও। অন্যের কাছে টাকা পাঠানো, অন্যের পাঠানো টাকা তোলা এখন হাতের মুঠোয়। হাতের মুঠোয় শব্দটি সহজলভ্যতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। এখন এটা শুধু সহজলভ্যই নয় শাব্দিক অর্থেই হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। হাতে একটি মোবাইল ফোন থাকলেই যেকোন জায়গা থেকে তা সম্ভব। শুধু টাকা পাঠানো বা উঠানো ছাড়াও কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বেতনভাতা বিতরণ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আহরণ, সরকারি অনুদানপ্রাপ্তি, মোবাইলে তাত্ক্ষণিক ব্যালান্স রিচার্জসহ বিভিন্ন সেবাও এখন হাতের মুঠোয়। এসব কাজ করতে যেতে হবে না ব্যাংকের কোন শাখায় অথবা অন্য কোথাও। মুঠোফোনের ব্যবহার করেই এসব সেবা পাওয়া যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে আমাদের জীবনে যোগ হয়েছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। ওইসব প্রযুক্তিরও ব্যবহার ও ক্ষেত্র বেড়েছে অনেক। ফলে বদলে গেছে জীবনযাত্রার মান। একসময়ে যা ছিল কল্পনা, এখন তা বাস্তব। কত কম সময়ে সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা যায় তার প্রতিযোগিতা এখন বিশ্বব্যাপী। উন্নয়নশীল দেশ হলেও বাংলাদেশ সে প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে নেই। মোবাইল ব্যাংকিং তেমনই একটি বিষয়। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে টাকা পাঠানো এখন একটি সফল উদ্যোগ। এটি এখন দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে অতি পরিচিত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত। এর মাধ্যমে আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে দেশের লাখ লাখ মানুষ। এমনকি এ ব্যাংক-লেড মোবাইল ব্যাংকিং মডেলটি ইতোমধ্যে সারাবিশ্বেই উদাহরণ হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল কাজের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গণমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং তাদের দোরগোড়ায় তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে গত কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। এজন্যে গুরুত্ব বিবেচনায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত টাকা পাঠানোর সহজ প্রক্রিয়া হিসেবে চালু করেছে মোবাইল ব্যাংকিং। আগে এই টাকা পাঠাতে অনেক সময় লাগতো, সমস্যাও হতো। এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠানো যায়। শুধু দেশের ভেতরে টাকা পাঠানোই নয়, প্রবাসীদের পাঠানো টাকা দ্রুত ও নিরাপদে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো; দোকানে কেনাকাটা; গ্যাস, বিদ্যুত্ ও টেলিফোন বিল প্রদান; রেল ও ক্রিকেট খেলার টিকেট কেনা; বেতন-ভাতা প্রদান ইত্যাদি সেবাও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমোদন দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০টি ব্যাংক এ সেবা চালু করেছে। অন্যগুলো শিগগিরই চালু হওয়ার প্রক্রিয়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা ব্যাংকগুলো সারা দেশে আড়াই লক্ষাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োজিত করেছে। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় কোটি ছাড়িয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ ২৩ হাজার ৬০৪টি। যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় চার লাখ বেশি। দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবমতে, মার্চ পর্যন্ত চলতি বছরে (২০১৪) মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের মোট লেনদেন হয়েছে তিন কোটি ৩৩ লাখ ৬২ হাজার ১৩৫টি এবং মোট লেনদেনের পরিমাণ ৭ হাজার ৮৪৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। যা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং ২০ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি। বর্তমানে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের মাধ্যমে ৭ ধরনের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এগুলো হলো: ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স, ক্যাশ-ইন ট্রানজেকশন, ক্যাশ আউট ট্রানজেকশন, পিটুপি ট্রানজেকশন, বেতন বিতরণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ। এছাড়া আরও কিছু সেবা আছে, যেগুলো সরাসরি উল্লিখিত ৬টি ক্যাটাগরির কোনটার অন্তর্ভুক্ত নয়, এই ধরনের সেবাসমূহকে অন্যান্য ক্যাটাগরির আওতায় বিবেচনা করা হয়। যেমন- স্কুল-কলেজের টিউশন ফি পরিশোধ। দেশে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রথম শুরু করা হয় ২০১০ সালের ৩১ মার্চ। এরপরের বছরে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত গাইডলাইন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য পরবর্তীতে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে ঝুঁকি মোকাবেলায় আরো একটি নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
