জীবনের প্রথম পাঠশালা আমার ঘর-বাড়ি

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ১৮:৪৮
আসলাম সানী, কবি ও ছড়াকার  আমার শৈশবের বা জীবনের প্রথম পাঠশালা আমার ঘর-বাড়ি। আমার গৃহশিক্ষক প্রয়াত চাচা মো. হাবিবউল্লাহ—যিনি আমাকে তাঁর সন্তানের অধিক স্নেহ করতেন—তিনিই আমাকে জীবনের প্রথম পাঠ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমার বাবার চাচি অর্থাত্ আমার দাদি ছিলেন পাড়ার এক প্রাইমারি গার্লস স্কুলের গাইড। তিনি আমাকে সেই স্কুলের শিশু শ্রেণির প্রথম বেঞ্চে নিয়ে বসিয়ে দিলেন—আমার স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্যে। সে হিসেবে আমার প্রথম স্কুলের নাম সিরাজউদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়। এই স্কুল গৃহের বাংলা ঘরে সারাদিনই খেলা করতাম বলে স্কুলে আনুষ্ঠানিক ভর্তি হয়েও খুব একটা উদ্দীপনা অনুভব করিনি। পাকা সারিবদ্ধ ক্লাসরুমের দালান মাঝখানে ছোট্ট মাঠ—মাঠে ঘাস আর চারপাশে ছোট্ট ফুলের বাগান আাামাকে বেশ আকৃষ্ট করতো। পরিবেশগতভাবেও পড়াশোনার জন্যে সেটি যে কী আকর্ষণীয় ও স্বাস্থ্যকর ছিলো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীকালে ভর্তি হওয়া খাজে দেওয়ান প্রাথমিক বালক বিদ্যালয়টিও ছিলো একতলা পাকা ক্লাসরুম আর সামনে কোনো মাঠ না থাকলেও বড়ো প্রশান্ত ছিল সেই পরিবেশ। রাস্তা-ঘাট ছিলো খোলামেলা। এখনকার বন্দি কারাগারসম পরিবেশ নয়, প্রতিকূল স্কুল বা শ্রেণিকক্ষ নয়, বরং সারাক্ষণ বাইরের মুক্ত আলো-বাতাসে আমরা পড়াশোনা করেছি বেড়ে উঠেছি। স্কুল এবং বাড়িতে পড়া-শোনার প্রক্রিয়াটা খুব সহজ- সাবলীল প্রাকৃতিক ও মানবিক ছিলো। আমি জন্মেছিলাম পুরোনো ঢাকার অনগ্রসর এক ঢাকাইয়্যা পরিবারে। এখানকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাষাগত জীবন ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন। শিক্ষা-জ্ঞানচর্চায় ছিলো অনাগ্রহ। আমার পরিবার প্রগতিবাদী সংস্কৃতিমনা বলে তাদের প্রভাব আমাকে অনেকটা চোখ মুখ প্রসারিত করার সুযোগ দিয়েছিলো। তারপরও বাড়িতে আমার জন্য টিউটোরিয়াল শিক্ষার জন্য পার্ট-টাইম গৃহশিক্ষকের আয়োজন ছিলো। আর তখনকার স্কুলের শিক্ষা ছিলো বেশ মৌলিক। পাঠ্যক্রমেই স্কুলে ও বাড়িতে পঠিত ও চর্চার ওপর প্রাধান্য ছিলো। তখন কোচিং-গাইড বই সাজেশন এগুলোর তেমন ব্যবস্থাও ছিলো না। কোনো কোনো অবস্থাশালী ছেলে-মেয়েদের ক্লাস টিচারের কাছে স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষাগ্রহণ করতে দেখা যেতো। আমরা স্কুলের দাগিয়ে দেয়া পড়া বা বাড়ির কাজ করতে খুব মনোযোগী ছিলাম। ইংরাজি, বাংলা, সমাজ, ধর্ম, বিজ্ঞান, ব্যাকরণ, সবই প্রায় মুখস্থ করতাম আর অঙ্ক কষতাম। সেই শৈশব থেকে কৈশোরে কিংবা যৌবনের শিক্ষা-আদর্শ-জ্ঞানচর্চা বহুশিক্ষক বা গুরু কথা-তাদের পাঠপদ্ধতি-চলাফেরা -বাচনভঙ্গি-আদব-কায়দা পথপ্রদর্শন জীবনের দিক নির্দেশনা হয়ে গিয়েছিলো-পরিপূর্ণ মানুষ হবার। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা একাডেমিক শিক্ষা নয়, মানবিক-সংবেদনশীল-সৃজনশীল শিক্ষায়ও অনেক উজ্জীবিত হয়েছি। আমাদের সময়ের এমন কিছু শিক্ষক ছিলেন যাঁরা প্রকৃতপক্ষে গুরু-ওস্তাদ বা জীবন দ্রষ্টা এবং পথপ্রদর্শক ছিলেন। আজ অনেক নামই বিস্মৃত প্রায়। তবে জীবনের বাস্তবতা এই—প্রাইমারি স্কুল-হাই স্কুল এবং কলেজ জীবনের অনেক শিক্ষকই পরিপূর্ণ জীবনে বয়সের তারতম্য ভুলে প্রায় বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। টিফিন পিরিয়ডে আমরা ক্লাসে বা স্কুল মাঠেই দৌড়-ঝাঁপ ছুটোছুটি করতাম। গোল্লাছুট, টেনিস, হা-ডু-ডু, চোর-পুলিশ নানা খেলাই ছিলো আমাদের বিনোদনের মাধ্যম। তখন ইনডোর গেইম বা এখনকার মতো এতো আধুনিক খেলাধুলার সুযোগ আমাদের হতো না, তবে বাত্সরিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা-সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও আন্তঃস্কুল ক্রিড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা ছিলো। তখন আমরা প্রতিদিনের পড়ার জন্য একটা রুটিন করে নিতাম। এখনকার মতো এতো গাদাগাদা বইয়ের বোঝা বা অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতাম না। বাড়ির একেবারে সঙ্গেই স্কুল, তা-তে মনে হতো না কোথাও দূরে যেতে হচ্ছে বা খারাপ লাগছে। আর আমাদের সময় ছেলে-মেয়ে বা বাচ্চাদের নিয়ে, মা-বাবাকে তেমন স্কুলে যেতে হতো না প্রায় বলা যায়। ভয় ছিলো না—হারিয়ে যাওয়া-ছেলেধরা নিয়ে যাওয়া বা পথে গাড়ি দুর্ঘটনার। নিরাপত্তা ছিলো—আমরা একাই স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। বাবা-মায়েরা নিশ্চিন্ত থাকতেন। তবে আমরাও কখনো কখনো স্কুল ফাঁকি দিয়ে স্কুলে না গিয়ে অন্যত্র খেলাধুলা-সিনেমা দেখা বা পুকুরে গোসল করে বাড়ি ফিরে বলতাম, স্কুলে গিয়েছিলাম। মোট কথা, পড়াশোনার ক্ষেত্রে এখনকার মতো এতো কড়াকড়ি বিষয়টাই ছিলো না। চাপ খুব একটা ছিলোই না বলা যায়। সেই শৈশব থেকে কৈশোরে আমার কয়েকটা স্কুল পরিবর্তন হয়। এক স্কুল ভালো লাগতো না—এই স্কুল থেকে ওই স্কুল বোধ হয় আরো ভালো—নতুনের প্রতি আগ্রহ থেকেই বলা যায় বহু স্কুল এবং নতুন নতুন সহপাঠী-বন্ধু জোটে। তাদের অনেকের সঙ্গেই মাঝে-মধ্যে দেখা হয়—সেই শিশুবেলার সহপাঠী জামাল উদ্দিন ইউসুফ, ইউনুস সুমন, ঢাকা ওয়াসার সোহরাব—এরা খাজে দেওয়ান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বন্ধু। দেখা হয়; কথা হয়, ওয়েস্ট এন্ড স্কুলের নূর হোসেন, রহমতউল্লাহ, আকবর, কতো বন্ধু কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এই স্কুলের এক ক্লাস সিনিয়র বন্ধু ছিলেন। অনেকেই আজ বিস্মৃত—আবার অনেকেই জীবন-জীবিকার নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। দেখা হলে-কথা হলে স্মৃতি জেগে ওঠে—ভালো লাগে—সোনালি অতীতে হারিয়ে যাই।