মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যত কোন তদারকি নেই। উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ব্যস্ত থাকেন বৃত্তি প্রদান, বইয়ের চাহিদা নিরুপণ ও বিতরণ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত কাজে। আর প্রকল্পের অধীনে জেলা পর্যায়ে কর্মরত সহকারী পরিদর্শকরা ‘চাকরি স্থায়ী নয়, তাই সন্তুষ্ট নয়’ এমন অযুহাতে কাজে মনযোগ দিচ্ছে না। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নে তদারকি করারও ‘কেউ’ নেই।
একাধিক বেসরকারি প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, তিন থেকে ছয়মাস পর পর সহকারী পরিদর্শকরা একবার স্কুলে আসেন। অনেকে ‘আপ্যায়ন’ শেষে চলে যান। এদের কাছ থেকে শিক্ষার মান উন্নয়নে কোন পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিক্ষক শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকেন। নিয়মিত স্কুলে আসেন না, পাঠদানে মনযোগী নন। পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর বেলায় এমনটি ঘটে। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, ঠিক মতো পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শিখন ক্ষমতার ওপর নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচিও গ্রহণ করা প্রয়োজন। কিন্তু একাজগুলো করার মতো মাধ্যমিক পর্যায়ে কেউ নেই। যদিও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টি তদারকি করেন। কিন্তু বাস্তবে এমন কোন তদারকি দেখা যায় না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩১৮টি সরকারি এবং ১৮ হাজার ৮৯০টি মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি স্কুল রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে ৭৯ লাখ ৩৭ হাজার শিক্ষার্থী। আর শিক্ষক রয়েছেন ২ লাখ ২১ হাজার। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকির জন্য উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। অনেক উপজেলায় একজন কর্মকর্তাও রয়েছেন। সে হিসাবে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ৪২৬ জন আর সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রয়েছেন ১৫৮ জন। আর জেলা পর্যায়ে রয়েছেন শিক্ষা অফিসার ছাড়া ৪ জন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ও একজন গবেষণা কর্মকর্তা।
ভান্ডারিয়ার শিয়ালকাঠি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিরন চন্দ্র বসু বলেন, কোন কাজ না হলেও দুই তিন মাস পর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকরা একবার আসেন। তবে প্রতি ১০ দিন পর একবার পরিদর্শনে এসে শিক্ষার মান নিয়ে তদারকি করলেও ভালো হতো।
ফরিদপুর জেলা শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করি সহকারি পরিদর্শকদের কাজে লাগাতে। তবে সহকারি পরিদর্শকরা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একটি প্রকল্পের অধীনে কাজ করছে। এই প্রকল্পের চাকরি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়। প্রকল্প শেষ হলে চাকরি চলে যাবে এমন শংকা থাকে তাদের মধ্যে। এ কারণে এসব কর্মকর্তারা কাজে ততটা আগ্রহী নয়।
রাজশাহীর এক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, জনবল কম থাকায় সব গুণগত মানের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না। তিনি জানান, একজন উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে অনেক কাজ করতে হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল তদন্তের দায়িত্ব শিক্ষা অফিসারকে দিয়েই করান। এছাড়া শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ কাজ, পরীক্ষার প্রশ্নতোলা, স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্বাচনী দায়িত্বসহ নানা কাজ করতে হয়। অফিসের কাজ করতে গিয়ে সময় পেরিয়ে যায়। ইচ্ছা থাকলে সব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার মান নিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে। শিক্ষকরা ক্লাসে একটি অংকের কিছু অংশ করিয়ে শিক্ষার্থীদের বলেন, বাকি অংশ বাড়ি থেকে করে আনবে। অশিক্ষিত বাবা-মা কীভাবে ওই অংকের বাকি অংশ করে দিবে। এছাড়া দরিদ্র পরিবারের পক্ষে প্রাইভেট পড়ানোও সম্ভব হয় না। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া মানিয়ে নিতে পারে না। এ কারণে শিক্ষার মান কমে এবং শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে।
ধামরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও বাংলাদেশ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন জানান, দেশে যতটুকু শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন হয়েছে মাঠ পর্যায়ে তার সবটুকু অবদানই শিক্ষা কর্মকর্তার। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের অনেক প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে । কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি। ফলে স্কুলে নানা কাজ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। শিক্ষার উন্নয়নে যেটুকু করা গেছে তা মোটিভেশনের মাধ্যমে করা হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নে প্রাথমিকে ক্লাস্টার প্রোগ্রাম রয়েছে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে এমন কোন প্রোগ্রাম নেই বলে তিনি জানান। তিনি শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে বলেন, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে কাজে আরো বেশি উজ্জীবিত করা যাবে।
