পাঁচ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা সফরকারী জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই দফা সংলাপে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। সাড়ে চার মাস পর বিএনপির পক্ষ থেকে এখন দাবি করা হচ্ছে, তারানকোর উপস্থিতিতে হওয়া ওই বৈঠকে দশমের পর দ্রুত একাদশ নির্বাচন দেয়া হবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তবে বিএনপির এই দাবি ‘অসত্য’ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ বলছে, ওই ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের প্রস্তাবের বিষয়টি সত্য হলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির মৌন সম্মতি ছিল কি-না, এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে পাওয়া জবাব ‘অস্পষ্ট’।
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিবদমান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য সৃষ্টির শেষ চেষ্টা হিসেবে গত বছরের ৬ থেকে ১১ ডিসেম্বর ঢাকা সফর করেন তারানকো। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত হিসেবে তখন ঢাকায় আসা তারানকো বিরামহীন দৌড়-ঝাঁপ, দূতিয়ালি ও বহু দেনদরবার শেষে তার সফরের চতুর্থ দিনে, অর্থাত্ ১০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসাতে সমর্থ হন তিনি। উভয় দলের মধ্যে পরদিনও দ্বিতীয় দফায় বৈঠক হয়। ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের বাসভবনে তারানোর উপস্থিতিতে এ দুই দিনেই সংলাপে বসেন দুই দলের চারজন করে আট নেতা।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন গভীর অনিশ্চয়তা ও দেশব্যাপী সহিংসতা চলছিল তখন তারানকোর মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই দুইটি বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, উপদেষ্টামণ্ডলীর দুই সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। আর বিএনপির পক্ষে ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মইন খান এবং ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘তারানকোর উপস্থিতিতে হওয়া ওই বৈঠকে তারা (আওয়ামী লীগ নেতারা) একাধিকবার আমাদেরকে বলেছেন যে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করতে হচ্ছে, এই নির্বাচনটি হয়ে যাওয়ার পরপরই আমরা দ্রুত আরেকটি (একাদশ) নির্বাচন দেবো, সেই নির্বাচন নিয়ে আমরা (দুই দল) এখনই কথাবার্তা বলতে পারি।’ ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সবার অংশগ্রহণে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেয়ার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তারানকোসহ আমরা যারা বৈঠকে ছিলাম, এটা সবারই জানা’। শুক্রবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনকেও এই তথ্য জানান ফখরুল।
তবে মির্জা ফখরুলের এ তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ওই দুইটি বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্তমানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বলেছিলাম- ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করতে হবে। এ ব্যাপারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেই বিএনপিকে অংশ নেয়ার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল। দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি আমরা দিইনি।
যদি ধরে নেয়া হয়- আওয়ামী লীগ দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাহলে কী বলা যায় যে- ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সায় ছিল? এই প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইত্তেফাককে বলেন, ‘না না, এখানে সায় দেয়া না দেয়ার বিষয় নয়, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।’ তাহলে জবাবে আপনারা কী বলেছিলেন, জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন- ‘আমরা তখনো বলেছিলাম সবার অংশগ্রহণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।’
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সায় বা মৌন সম্মতি থাকা না থাকার বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি বিএনপির মুখপাত্র ফখরুল। তবে ‘নির্বাচনে বিএনপির সায় ছিল না’- এমন কথাও বলেননি তিনি।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমুর কাছে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিএনপি নেতারা বারবার শুধু নির্বাচন পেছানোর কথা বলেছিলেন। আমরা তাতে রাজি হইনি।’
আওয়ামী লীগ নেতার এই বক্তব্য সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের কাছে তো কোনো লিখিত চুক্তিনামা নেই; কিন্তু আওয়ামী লীগ যে দ্রুত নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটি তো সত্য। এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে সরকার প্রতিনিয়ত বলছে, সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর পর একাদশ নির্বাচন হবে।
