কর্মস্থলে না থেকেও তারা শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন!

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২৪
নিজে কর্মস্থলে থাকেন না, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা সেবার খোঁজ-খবর নেন না। চিকিত্সকরা নিয়মিত হাসপাতালে এলো কিনা সেই খবরও রাখেন না। জড়িত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। তারপরও কিনা তারাই দেশের শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন। সমপ্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতর ৭টি বিভাগের সিভিল সার্জনদের মধ্যে ৪৯ জনকে শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন ও রানার আপ হিসাবে পুরস্কৃত করে। সিভিল সার্জনদের ব্যাপারে মফস্বলের চিকিত্সকদের অভিযোগের শেষ নেই। তারা বলেন, জুনিয়র চিকিত্সক হাসপাতালে কি থাকবেন? সিভিল সার্জনরাই কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারীরা কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন কিনা সেই খবরও রাখে না। অথচ পুরো জেলার চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সিভিল সার্জনের কাঁধে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে নেমে পাওয়া গেছে অবিশ্বাস্য তথ্য। অনেক ক্ষেত্রে চিকিত্সকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন সিভিল সার্জনের নীরব সমর্থনে। এর বিনিময়ে সিভিল সার্জন পান মাসোহারা। এছাড়া নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, ওষুধ পাচার, রোগীদের খাবার সরবরাহের টাকা আত্মসাত্সহ নানা অভিযোগ আছে সিভিল সার্জনদের বিরুদ্ধে। আর এসব অনিয়ম দেখে কাজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন সদ্য যোগ দেয়া চিকিত্সকরা। এগুলো দেখতে দেখতে তারাই একসময় বলেন, স্বাস্থ্য সার্ভিসে সততা, নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতার কোন মূল্য নেই। সত্ ও নিষ্ঠাবান চিকিত্সকরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। হন পদোন্নতি বঞ্চিত। দুর্নীতিবাজ সিভিল সার্জনরা বিভাগীয় পরিচালক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য কিংবা কেনাকাটার নিয়ন্ত্রণের সিন্ডিকেটকে উেকাচ দিয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। দুইজন সিভিল সার্জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে যখন কাজের জন্য যাই সেখানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই অফিসে থাকেন না এবং সভা সেমিনারের কথা বলে নিয়মিত বাইরে থাকেন। বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাত্ ও ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতির সঙ্গে তারাই বেশি জড়িত। এদের সঙ্গে আবার মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা জড়িত। তাদের কাছে যে বেশি ঘুষ দেয়, তারই বেশি কদর। তাকেই পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও ভাল জায়গায় বদলি করা হয়ে থাকে। ওই দুই সিভিল সার্জন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরই হচ্ছে স্বাস্থ্য সার্ভিসের প্রধান খুঁটি। সেখানে যদি এই চিত্র হয় তাহলে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কেমন হবে তা আর বলে দিতে হবে না। শীর্ষ প্রশাসনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলে জেলা উপজেলাতেও শত ভাগ কাজ হবে বলে তাদের দাবি। ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন হয়েছেন। তিনি বেশিরভাগ সময় কর্মস্থলে থাকেন না। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন দায়িত্ব পালন করেন। সদর উপজেলাসহ ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সক, নার্স, কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, সিভিল সার্জন নিজে কর্মস্থলে থাকেন না। তিনি উপজেলার খবর রাখবেন কখন। ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি তানভীর হাসান তানু ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এই চিত্র দেখতে পান। ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন ডা. আফজাল হোসেন তরফদার বলেন, ঠাঁকুরগাঁওবাসী, সুধী মহল ও রাজনৈতিক সহযোগিতার কারণে তিনি শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন হয়েছেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও যথাযথভাবে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার সফলভাবে নিশ্চিত করায় তাকে শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন করা হয়েছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিত সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকায় অফিসিয়াল কাজ থাকলে পরবর্তী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে যান। রংপুর বিভাগের আরেকজন সিভিল সার্জনকে শ্রেষ্ঠ করা হয়েছে। তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা মানে না। নিজে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টোল কালেক্টরের জন্য পছন্দের লোক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বাণিজ্য করে আসছেন। সেই সিভিল সার্জন হাসপাতাল ম্যানেজমেন্টে সফলতার কারণে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। কুড়িগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. লোকমান হাকিম রানার আপ হয়েছেন। তার বাড়ি ঐ জেলার উলিপুর উপজেলায়। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে তিনি নিজ জেলায় চাকরি করতে পারেন না। সদরসহ ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ফজলে এলাহী স্বপন গিয়ে কর্তব্যরত চিকিত্সক, কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করেন। এসময় তারা বলেন, কোন কোন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ মাসে একবার সিভিল সার্জনের দেখা মেলে না। তিন মাসে কোন কোন হেলথ কমপ্লেক্সে যাননি সিভিল সার্জন। তার বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতসহ রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. লোকমান হাকিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বাড়ি একই জেলার উলিপুর উপজেলায়। জেলার স্বাস্থ্যসেবায় কোয়ালিটি সার্ভিসের জন্য তাকে শ্রেষ্ঠ সিভিল সার্জন করা হয়েছে। তিনি নিয়মিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম দেখভাল করেন বলে দাবি করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সিভিল সার্জনদের মধ্যে যারা ৮টি বিষয়ে সফল হয়েছেন কিংবা পরিবর্তন এনেছেন তাদেরকে বিভাগীয় পরিচালকের সুপারিশ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের কমিটি যাচাই বাছাই করে ৭টি বিভাগে ৪৯ জন সিভিল সার্জনকে শ্রেষ্ঠ হিসেব পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। সিভিল সার্জন সরকারি ওষুধসহ গ্রেফতার চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. খন্দকার মিজানুর রহমান অনৈতিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় তার একজন বান্ধবী ও সরকারি ওষুধসহ গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে তারা উভয়ে জেল হাজতে রয়েছেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি গোয়েন্দা দল খুলনাস্থ করিমাবাদ ব্যাংক কলোনীর বিপরীতে অবস্থিত একটি বাড়ি থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের গ্রেফতার করে।