কেজিতে মুনাফা ৫ লাখ রুপি

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২৬
২০১২ সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা। এমিরেটস্-এর দুবাই-কোচি ফ্লাইটে উঠেছেন তিনজন ভারতীয় যাত্রী। এদের দুজনের পরিচয় স্বামী-স্ত্রী। অপরজন তাদের পারিবারিক বন্ধু। ভদ্রমহিলা এমন ভাব করছেন, তিনি যেন অন্তঃসত্ত্বা। পেট উঁচু হওয়ায় দুবাইয়ে কাস্টমস্ কর্মকর্তারা আর সন্দেহ করেননি। তিনজনই ইতিমধ্যে বোর্ডিং পাস নিয়ে এমিরেটস ফ্লাইটে উঠে পড়েছেন। ক্রু এবং আশপাশের যাত্রীরা ভদ্রমহিলার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কারণ এ গরমের মধ্যেও তার পরনে মোটা জ্যাকেট। দুবাই থেকে ফ্লাইটটি কোচিন পৌঁছার পর তিনজন লাগেজও সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু পেছন থেকে কাস্টমস্ কর্মকর্তারা ভদ্রমহিলাকে ডাকলে তার মুখ শুকিয়ে যায়। পরে ভদ্রমহিলার শরীরে পেচানো অবস্থায় ২০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এই হলো ভারতে সোনা চোরাচালানের চিত্র। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব মতে, প্রতিবছর চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতে সোনা ঢুকছে দেড়শ থেকে দুইশ টন। মূলত: সোনা আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার কারণে ভারতে সোনা চোরাচালান বেড়েছে বলে সেখানকার সংবাদ মাধ্যম উল্লেখ করেছে। সোনা চোরাচালান উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণে ভারতের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে সেখানে চোরাচালানের ঘটনা উদঘাটনও বেড়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে ২২১টি সোনা চোরাচালানের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে সেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৮৮৫টি সোনার চালান ধরা পড়েছে। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে এ সংখ্যা ৭০০টিরও বেশি। ভারতের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে চোরাকারবারিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে সোনা চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলো। কিন্তু গত দুবছর ধরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে এখানেও সোনা চোরাচালানের ঘটনা ধরা পড়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চোরাচালানের ১০৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির সরকার সোনা আমদানির উপর শুল্ক চার শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। ভারতে এখন প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ৩১ হাজার ১০ রুপি। এই দাম দুবাইয়ের চাইতে চার হাজার রুপি বেশি। দুবাই থেকে এক কেজি সোনা কিনে তা ভারতে বিক্রি করলে ৫ লাখ রুপির বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। এর ফলে সোনা চোরাকারবারিদের উত্সাহ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলদার আহমেদ সেলিম বলেন, বাংলাদেশে চোরাচালানের যত সোনা ধরা পড়ছে তার প্রায় সবগুলোর গন্তব্য ভারত। এখানে শুধু বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সোনা আমদানিতে ভারত সরকার কড়াকড়ি আরোপ করায় সেখানে চোরাচালানের ঘটনা বাড়ছে বলে তিনি জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতের চোরাচালানকারীরা সোনা চোরাচালানের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যবহার করছে। দুবাই, আবুধাবি এবং শারজাহ থেকে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে আসেন তাদের ওপর ভর করে চোরাকারবারিরা। বাংলাদেশে আসার পর সীমান্ত দিয়ে এসব সোনা চলে যায় প্রতিবেশি দেশগুলোতে। শুধু বাংলাদেশ নয়, নেপাল হয়েও ভারতে সোনা চোরাচালান হচ্ছে বলে দেশটির আইন-শৃংখলা বাহিনী মনে করছে। সৌখিন ভারতীয়দের কাছে সোনা এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো যে, এটির আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারের কোষাগারে টান পড়ছিলো। এক হিসেবে দেখা যায়, সোনা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিলো ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলারে। এছাড়া গতবছরের মে মাসে ভারতে সোনা আমদানি হয়েছিলো এক লাখ ৬২ হাজার কেজি। শুল্ক বাড়ানোর পর নভেম্বর মাসে তা ১৯ হাজার নয়’শ কেজিতে নেমে আসে। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতে সোনাকে আর্থিক সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।