একই অফিসে দুই বন্ধু

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৫৯
বহুদিন পর আমার কলেজে ছাত্রী রূপে না ঢুকে শিক্ষিকা হিসেবে যেদিন আমি ঢুকলাম, সেদিন আমার ভীষণ ভয় করছিল। অদ্ভুত, কিন্তু যখন প্রথম ছাত্রী হিসেবে ঢুকেছিলাম তখনও ভয়ই করেছিল। তবে সেই কলেজের শিক্ষিকা হতে পেরে আমার খুব ভালোও লাগছিল। একই কলেজে, যেখানে আমি শিক্ষকদের সবসময় ভয় পেতাম, সেখানে আজকে আমিই পড়াব- এই সত্যটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার প্রথম দিনের চাকরির অভিজ্ঞতা খুবই ব্যতিক্রমী। আমি প্রধান শিক্ষিকার সাথে দেখা করতে বসে আছি এমন সময় পেছন থেকে এসে একজন জাপটে ধরল আর হৈ চৈ! আমি তো চমকে উঠলাম। আরে পেছনে ফিরে দেখি সোমা। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি আর সোমা স্কুল, কলেজ-বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাদের একই। আমি আর সোমা ক্লাস থ্রি থেকে একসাথে কামরুন্ননেসা স্কুল ও পরে আইডিয়াল কলেজে পড়ি। নতুন জায়গায় নতুন বন্ধু যোগাড় এক কঠিন প্রক্রিয়া। তাই আমি কখনই ছোটবেলার বন্ধুদের হারাতে চাইনি। স্কুলের বন্ধুদের চেয়ে আপন বন্ধু খুব কমই হয়। সে জন্য আমি আর সোমা একসাথে কলেজে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেই। আমরা দুইজনই সুযোগ পাই, তবে আলাদা বিষয়। তবু আমাদের নিয়মিত দেখা হত। পড়া শেষে ওর কোন খবর পাচ্ছিলাম না। ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি সে নেই। মনে হয়েছিল আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে হারালাম। আর আজকে গণিতের শিক্ষিকা হিসেবে এসে ওকে যখন বিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসেবে পেলাম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। প্রায় গত এক বছর ধরে ওর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছি কিন্তু সক্ষম হইনি। আজকে চাকরি জীবন আমাদের দুই বছর হতে চলল। কলেজ জীবনে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলার সুযোগ অনেক বেশি। আমি আমার স্কুল জীবনের বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করছি। আমার মত বিরল সৌভাগ্য খুব কমই হয়। সব সমস্যা, আনন্দ আমরা একসাথে ভাগ করে নেই। আমরা একসাথে একজন অপর জনের সুবিধা অসুবিধায় সবসময়ই আছি। এভাবে শিলা তার জীবনের সুন্দর অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন । শিক্ষা জীবনের পর চাকরি জীবন এক নতুন অধ্যায়। সহপাঠীর সম্পর্ক আর সহকর্মীর মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে অনেক পার্থক্য। শিক্ষা জীবনে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকলেও তাতে নিরেট বন্ধুত্বের পরিমাণ অনেক বেশি। সেখানে কর্মজীবনে সহকর্মীদের মধ্যকার সম্পর্ক কেবলই প্রতিযোগিতার ও বাণিজ্যিক। তাই সে কর্মজীবনে শিক্ষা জীবনের বন্ধু পেলে তা এক ভিন্ন চিত্র বয়ে নিয়ে আসে। এই দুই সম্পর্কের সংমিশ্রণের ফলাফল জানতে কথা হচ্ছিল লাজিনার সাথে। বর্তমানে তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ডিপার্টমেন্ট থেকে তিনি অনার্স সম্পন্ন করেন। এখানে তারা চার বন্ধু রয়েছেন একই ডিপার্টমেন্টের। তারা কেউ কেউ ব্যাচমেট আবার তাদের সাথে ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ভাইও রয়েছেন। তার সাথে একজন একই বিভাগে রয়েছেন এবং অপর দুজন রিপোর্টিং বিভাগে রয়েছেন। লাজিনা বলেন, চাকরি জীবনে এসে বন্ধুর ক্ষেত্রে একই সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক যেমন থাকে তেমনি সহকর্মীর সম্পর্কও পালন করতে হয়। বন্ধুদের পেয়ে চাকরি জীবনে পরিবেশ অনেক বন্ধুময় হয়ে ওঠে। যেকোনো চাকরি চালিয়ে যেতে হলে সে চাকরির সাথে, তার পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। চাকরির পরিবেশ ভালো না লাগলে সে চাকরি করে যাওয়া খুব কঠিন। মনের সাথে না মিললে তা এক ধরনের অত্যাচার। কিন্তু বন্ধুদের পেলে চাকরির পরিবেশ অনেক বন্ধুসুলভ হয়ে উঠে। একটা নিজেদের গ্রুপ তৈরি হয়, একজন আরেকজনের সমস্যায় সাহায্য করা যায়। কাজের পরিবেশ ভালো লাগলে, কাজ ভালো লাগে। অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যায়। যা চাকরি জীবনেও সাফল্য এনে দেয়। তেমনি আলাপ হচ্ছিল নুসরাত নাহার নাজরীনের সাথে। তিনি একটি বেসরকারি টিভির ভিডিও জার্নালিস্ট হিসেবে চাকরি করছেন। তিনি বলেন, স্ট্যাম্পফোর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে আমি অনার্স সম্পন্ন করি। বর্তমানে আমরা দুজন একই বিভাগের এক ডিপার্টমেন্টের রয়েছি। চাকরি জীবনে বন্ধুদের পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। আমার দুই বন্ধু অন্য একটি টিভিতে রয়েছে। যেহেতু একই ধরনের কাজ, তাই ওদের সাথে নিয়মিতই দেখা হয়। বন্ধুদের চাকরিক্ষেত্রে সঙ্গী পেলে সবধরনের সুবিধা-অসুবিধায় পাশে পাওয়া যায়। একজন আরেকজনকে আগে থেকে চেনায় সবধরনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করা যায় এবং পাওয়া যায়। বন্ধুরা মিলে একটি গ্রুপ হওয়ায় তখন চাকরির নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়া সহজ হয়। সহপাঠী যেমন শুধু সহকর্মী হয় না, তেমনি শুধু সহপাঠীই রয়ে যায় না। সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে কিছুটা বদলায়, তবু সহপাঠী কখনো শুধুই সহকর্মী হয়ে উঠে না। কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যুদ্ধে একই সাথে অংশগ্রহণ করা যায়, যা প্রতিযোগিতার ঢেউয়ে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলতে সাহায্য করে। তাই বন্ধুদের সহকর্মী হিসেবে পেয়ে আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি।