ইউক্রেন নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:০৯
ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হচ্ছে। দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া একে অপরকে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে আবারো অবরোধ আরোপের চিন্তা করছে। তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইচ্ছা থাকলেও কিছু করতে পারছে না। কারন রাশিয়া এই পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এর মধ্যে পাওয়া গেল এক ভয়ঙ্কর তথ্য। ইউক্রেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগে রাশিয়া হুশিয়ারি দিয়েছিল স্বার্থে আঘাত লাগলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যবস্থা নিতে পারে। আর এই হুশিয়ারির মাধ্যমে হামলাকে বোঝানো হয়েছে সেটা সহজেই অনুমেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি এবং ইতালি অভিযোগ করেছে, রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তবে রাশিয়ার পাল্টা অভিযোগ, রাশিয়া নয়, বরং ইউক্রেন চুক্তি লঙ্ঘন করছে। চুক্তিতে ইউক্রেনে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দখল করা ভবন থেকে চলে যাবে এবং ইউক্রেন সরকারও তাদের ওপর কোনো হামলা কিংবা নির্যাতন চালাবে না এবং যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের নি:শর্ত মুক্তি দিবে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সেই চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা ইউক্রেন সরকারকেই অবৈধ বলে উল্লেখ করেছেন। শুক্রবার ওবামা ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মান, ইতালির সরকার প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে একমত হয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, প্রয়োজনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভ্রমনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে থাকা ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে অভিযান চালাচ্ছে ইউক্রেন বাহিনী। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই অভিযানকে ‘রক্তাক্ত অপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। শুক্রবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সীমান্তের এক কিলোমিটারের মধ্যে এসে গেছে রুশ সৈন্যরা। এরপর ইউক্রেন প্রধানমন্ত্রী আরসেনি ইয়াতসেনুক অভিযোগ করেন, রাশিয়া রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে ইউক্রেনকে দখল করতে চায়। আর এই সংঘাত তারা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে চায় যা বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে। ইউক্রেন সেনাবাহিনী অভিযানে স্লোভিয়ানস্ক শহরে বৃহস্পতিবার দুইজন বিচ্ছিন্নতাবাদীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৫জন বিচ্ছিন্নতবাদী নিহত হয়েছে। এরপর রুশ পররষ্ট্রমন্ত্রী হুশিয়ার করে দেন, রাশিয়ার স্বার্থে আঘাত লাগলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ ওশেটিয়ার উদাহরণ টেনে ল্যাভরভ বলেন, রুশদের স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত এলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জবাব দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। ২০০৮ সালে দক্ষিণ ওশেটিয়া ইস্যুতে জর্জিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় রাশিয়া। সেখানে রুশ বাহিনী জর্জিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েক দিন ধরে অভিযান চালায়। ইউক্রেন সঙ্কট নিরসনে কিয়েভ সরকার ১৭ এপ্রিলে জেনেভায় হওয়া চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না বলে ফের অভিযোগ করেন ল্যাভরভ। ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়াকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আর পশ্চিমা বিশ্বও সতর্কতার সঙ্গে এগুচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর কূটনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করলেও সেটা সম্ভব নয়। কারন নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়াবিরোধী কোনো প্রস্তাব পাস করা সম্ভব না। কারন রাশিয়া এই পরিষদের স্থায়ী সদস্য। আর কোনো স্থায়ী সদস্য কোনো প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিলে সেই প্রস্তাব পাস হবে না। নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কাজ না করতে পেরে পশ্চিমা বিশ্ব উন্নত দেশের সংগঠন জি-৭ এর মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে এই চাপ রাশিয়াকে তার কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে পারবে কিনা সেটা এখন বলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়ার ওপর কেবল কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবেই চাপ সৃষ্টি করবে না যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক দিক থেকেও চাপ সৃষ্টি অব্যাহত আছে। আর তার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। ন্যাটো বাল্টিক অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর আকাশে বিমান টহল জোরদার করেছে। পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ায় মার্কিন সৈন্য অবতরণ করতে পারে। আর ইতোমধ্যে ন্যাটো মিত্রদের আশ্বস্ত করতে ওই অঞ্চলে ছয়শ’ সৈন্যের একটি কন্টিনজেন্টের অংশ হিসেবে শনিবার মার্কিন বাহিনী লিথুয়ানিয়ায় অবতরণ করেছে। লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট দালিয়া গ্রিবসকাইতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পদক্ষেপের ফলে ওই অঞ্চলে উত্কণ্ঠা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ‘নিরোধক পদক্ষেপ’ হিসেবে মার্কিন সৈন্যের আগমনকে স্বাগত জানান। বুধবার পোল্যান্ডে আরেক কোম্পানি এবং শুক্রবার লাটভিয়ায় অবতরণ করেছে এবং আজ সোমবার এস্তোনিয়ায় আরো ১৫০ জন সৈন্য আসার কথা রয়েছে। ওয়াশিংটন মঙ্গলবার বলেছে, তারা ওই অঞ্চলে উপস্থিতি বাড়াতে এবং ন্যাটো মিত্র ও তার সহযোগীদের আশ্বস্ত করতে ওই অঞ্চলে ৬০০ সৈন্য পাঠাচ্ছে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ইউক্রেন নিয়ে একদিকে রাশিয়া ও অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতি আগ্রহের’ বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পূর্ব-পশ্চিমে টানাটানি চলেছে ভূখণ্ডটিকে নিয়ে। চলমান ঘটনা সেই পুরোনো খেলারই আরেক দফা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত করতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি গড়তে চান শুল্কভিত্তিক জোট ‘ইউরেশিয়ান ইউনিয়ন’। পুতিনের প্রত্যাশা, ইউক্রেন হবে ইইউ-এর পাল্টা এ জোটের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইউক্রেনের সীমান্তে সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে রাশিয়া। সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (রাশিয়া অ্যান্ড ইউরেশিয়া প্রোগ্রাম) এর উপ-পরিচালক জেফরি ম্যানকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াতে চাইছে না। কারন ইরান এবং সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের এটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে যে ইউক্রেনের জন্য ঝুঁকি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি না করা। বরং উভয় পক্ষকে একটি সমাধানে পৌছানোর জন্য তাগিদ দেওয়াটাই তাদের মূল কাজ হবে। কারন ইউক্রেণে রাশিয়ার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অর্থনীতি এবং অবকাঠামো খাত ব্যাপকভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তবে দেশটির অর্থনীতি তেমন শক্তিশালী হতে পারেনি। আধুনিকতাও তেমন নেই। আর তাই দেশটিতে এখন সংস্কার প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। আর এটা না হলে রাশিয়াও ঝুকিপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে।