১৮ এপ্রিল। উনিশ হাজার ফুট উপরে এভারেস্টের পাথরের দেখা নেই। হিম শীতল ঝোড়ো বাতাসের শব্দও কানে আসছে না। শুধুমাত্র মুখের চামড়া টের পায় ঠাণ্ডার তীব্রতা। চারদিকে বরফের ভারি আস্তর। একেকটা ভীমকায় হিমবাহ একটি শ্বেতশুভ্র সরকারি অফিস ভবনের সমান। উপরে কিছু হিমবাহকে ঝুলতেও দেখা যায়। থেকে থেকে কিছু তুষার শেরপাদের উপর খসেও পড়ে সেখান থেকে। এভারেস্টের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকার নাম পপকর্ন ফিল্ড। কিন্তু শেরপারা এর নাম দিয়েছেন খুম্বু আইসফল। নেপালি ভাষায় খুম্বু মানে বিশ্বাসঘাতক। তবে বরফ আস্তরের গভীরে বিরাট ফাটল থাকলেও কিছু করার নেই। পর্বতারোহণ মৌসুমের অপেক্ষায় বহু বিদেশি অভিযাত্রী। এরই মধ্যে অনেকেই জড়ো হওয়া শুরু করেছেন পর্বতের বেইজ ক্যাম্পে। যাদের অধিকাংশেরই পাহাড়ে ওঠার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। সৌখিন এ সব অভিযাত্রীদের জন্য পথ প্রস্তুত করাই শেরপাদের কাজ। গালে কনকনে ব্যথা নিয়ে হাতের সরঞ্জাম আর কোমরে বাঁধা দড়ির উপর আস্থা রেখেই ঝুলতে ঝুলতে অতি মনোযোগের সাথে সেই কাজ করে যাচ্ছিলেন একদল শেরপা। সময় খুব বেশি নেই, আগামী মে মাসেই শুরু হচ্ছে এভারেস্ট আরোহণের মৌসুম। ওদিকে উপরের হিমবাহে ফাটলের গভীরতা যে বিরাট আকার ধারণ করেছে, সেটা তারা খেয়ালই করেননি। ঠিক এমন সময় ঘটে ঐ দুর্ঘটনা। ধসে পড়ে বিশালকায় হিমবাহ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পর্বতের ঢাল বেয়ে একেবারে নিচের উপত্যকায়। হিমপ্রপাতের মতোই ঝরে যায় ১৬টি প্রাণ। গুরুতর আহত হন আরো বেশ কয়েকজন।
হিমালয় পাদদেশের গ্রামগুলোতে শোকের মাতম। এতো মৃত্যু এক সাথে কোনদিন দেখেনি তারা। সাদা কাপড়ে মোড়া লাশগুলো এক স্থানে রাখার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি শেরপা আর পর্যটন ব্যবসায়ীরা। সহকর্মীদের এভাবে দেখতে হবে, কোনদিন ভাবেননি তারা। এ অবস্থায় শেরপারা পর্বতারোহণ না করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের এই ঘোষণার পর অনেক পর্বতারোহী বেইজ ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছে। সেখানকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পে জড়ো হয়েছিলো প্রায় ৩শ’ জনের ৫০টি দল। এর মধ্যে হতাশ হয়ে ৩১টি দল ঐ ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, অধিকাংশ অভিযাত্রী পর্বত আরোহণের আশা ছেড়েই দিয়েছেন।নেপাল মাউন্টেইনিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অং শেরিং শেরপা জানান, এখন শোকের সময়, পর্বতে ওঠার সময় নয়। চলতি বছর আর কোন পর্বতারোহণের কথা শোনা যাবে না।
শেরপারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি কারণে তারা পর্বতারোহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তা হলো- পর্বতে নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বেগ আর ভীতি তৈরি হয়েছে গোটা শেরপা সমপ্রদায়ের মধ্যে। একই সাথে বিদেশি পর্বত অভিযাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া অর্থ তাদের জীবনের ঝুঁকির তুলনায় কতটুকু পর্যাপ্ত তা নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে শেরপা জনগোষ্ঠী। পর্বতারোহণের অনুমোদন সাধারণত নেপাল সরকারের তরফ থেকেই হয়ে থাকে। শেরপাদের কাছ থেকে সে বাবদ রাজস্বও কেটে রাখে সরকার। নিহত স্বজনদের জন্য সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে সাড়ে চারশ’ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিলেও স্বজনদের আপত্তির মুখে বিপত্তি দেখা দেয়। সরকার পাঁচ হাজার ডলার দিতে চাইলে নিহতের স্বজনরা দশ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করে। শুধু শেরপা নয়, বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোও সতর্কতা জারি করেছে পর্বতের নিরাপত্তা ইস্যুতে। বিপুল বরফ আস্তর বার বার ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা। আবার অনেকে লাশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আসন্ন মৌসুমে পর্বতারোহণ পুরোপুরি স্থগিত রাখার পক্ষপাতি। শেরপারা চান, আরো ভালো নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং আরো উন্নত চিকিত্সা সুবিধা।
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ বলে কথা। সেখানে উঠতে অনুসন্ধিত্সু মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। ২৯ হাজার ২৯ ফুট উচ্চতার চড়াই উত্রাই পেরিয়ে এভারেস্ট জয়ের স্বাদ পেতে প্রতিবছর শত শত মানুষ ভীড় করেন পর্বত পাদদেশ নেপালে। কিন্তু এখন কি এই পর্বত জয় করার মানসিকতা বাদ দিতে হবে। আর কি কেউ এভারেস্ট জয় করবে না! শেরপাদের সাহায্য ছাড়া এভারেস্ট অভিযানের চিন্তা করা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের এই শোক সাময়িক। মে মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া তিনমাসের এক মৌসুমে একজন শেরপা আয় করেন আট হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত। যা নেপালের জাতীয় গড় আয়ের দশ গুণ। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, একেবারেই কাজ না থাকলে পর্বতেই ফিরে আসা ছাড়া শেরপাদের আর কোন উপায় হয়তো থাকবে না। তবে সব দাবি দাওয়া নিয়ে এখনো শেরপাদের সাথে সরকারের দরকষাকষি চলছে। গাইডদের লাইসেন্সের মেয়াদ এরই মধ্যে পাঁচ বছর বাড়ানোর কথা জানিয়েছে সরকার।
