সিসির অভ্যুত্থানকে ইইউ’র বৈধতা?

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১০
কোনিদকে এগুচ্ছে মিসর? কী হতে যাচ্ছে আসছে নির্বাচনে? এ প্রশ্ন দুটির উত্তর বিশ্বের রাজনীতি বিশ্লেষকদের অজানা নয়। মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থকদের উপর দমন-পীড়ন যে অব্যাহত থাকবে, তা বুঝতে কারোরই বাকি নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচে’ সিনিয়র পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাস্টনের সাম্প্রতিক মিসর সফর এমন ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে। এ সময় তিনি দেখা করেন কেবল আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসি এবং একজন বামপন্থী রাজনীতিবিদের সঙ্গে, যারা আসছে ৩০ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন। কিছু জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে অ্যাস্টন মুসলিম ব্রাদারহুডের কোনো নেতার সঙ্গে দেখা করেননি। তিনি এও নিশ্চিত করেন যে, সফরের আগে এই গ্রুপের কারো সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করেননি। এতে দারুণ চটেছে অভ্যুত্থান-বিরোধী জোট। অ্যাস্টনের এ সফরকে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, মিসরের বর্তমান সরকারের ৩০ জুনের (সেদিন নির্বাচন) রোডম্যাপকে ইইউ’র সমর্থন দেয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না, যাই ঘটুক না কেনো, প্রমাণ করার চেষ্টা করা হবে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে এবং নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দুর্নীতি-মুক্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কেউ কেউ বলছেন অ্যাস্টনের এ সফরের অর্থ সিসি’র অভ্যুত্থানকে সমর্থন দেয়া, বৃহত্ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে অতিসম্প্রতি যিনি উর্দি ছেড়েছেন। অ্যাস্টনের কথা মানলে মিসরে সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছে। কিন্তু ব্রাসেলসে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ভিন্ন কথা বলছেন। লন্ডন-ভিত্তিক সাংবাদিক অ্যালেস্টার স্লোয়ান এদের একজনের সঙ্গে কথা বলে দেখেছেন তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা মিসরের সকল অনিয়ম সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের দিক থেকে। এর আগে ক্যাথেরিন অ্যাস্টন অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে মিসর সফর করেছিলেন। সে সময় তাঁর গোপন সাক্ষাত্ হয়েছিল মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসির সঙ্গে। তাঁকে বন্ধু পরিবেষ্টিত অবস্থায় এবং ফ্রিজ ভর্তি খাবারের পাশে দেখে অ্যাস্টন তখন খুশিই হয়েছিলেন। তবে মোরসিকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর ফের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সেই সাথে সেনাবাহিনীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করার। সেই সাক্ষাতের পর অ্যাস্টন গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘এর মানে পুলিশ রাষ্ট্রের জন্য কাজ করছে। এর মানে বিচার বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে স্বাধীনভাবে। জনগণের অধিকারগুলোর প্রতি সম্মান জানানো হচ্ছে। শোনা হচ্ছে তাদের মতামত।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পুলিশ ও সেনাবাহিনী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসির হয়ে কেন কাজ করলো না। পরিবর্তে কেন তাঁকে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো, আর কেনইবা অবর্ণনীয় নির্যাতন সইতে হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের। তবে অ্যাস্টন একটি কথা বলেছেন, তাঁরা সহিংসতাকে সমর্থন করেন না। ভোটে যাই হোক না কেনো, ফলাফল যে সিসি’র পক্ষেই যাবে তা আন্দাজ করা যাচ্ছে ভালভাবেই। সত্যি বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যে কেমন হবে তা বোঝা গেছে সংবিধান সংশোধন উপলক্ষে আয়োজিত ভোটের দ্বারাই। সংবিধান সংশোধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই সইতে হয়েছিল নির্যাতন। এ অবস্থায় সংবিধান সংশোধনের পক্ষে বেশি ভোট পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। আসলে মিসরের লোকজন বর্তমান দুরভিসন্ধিমূলক প্রক্রিয়াকে না বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সিসি-বিরোধী অধিকাংশ পত্রিকাই এখন বন্ধ। সন্ত্রাসী সংগঠনের অপবাদ জুড়ে দেয়া হয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের নামের সঙ্গে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতও যে রক্তে রঞ্জিত, সে কথাটি কেউ বলার সাহস পাচ্ছে না। সত্যিই বাস্তববাদী ক্যাথেরিন অ্যাস্টন এবং তাঁর ইইউরোপীয় ইউনিয়ন। মিসর ও ইইউ একে অপরের সর্ববৃহত্ বাণিজ্যিক অংশীদার। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই মিসরের আসছে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না ইইউ। মিসর ইউরোপ থেকে প্রধানত আমদানি করে, ওষুধপত্র ও রাসায়নিক সামগ্রী। আর রাপ্তানি করে মূলত বোনা কাপড় ও কৃষিজ পণ্য। ২০১২ সালে এই দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছিল ২৪ বিলিয়ন ইইউরোতে (৩১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এতে মিসরের ট্রেড ভলিউম ছিল ২৩ শতাংশ। তবে এ কথাটি ঠিক যে, মিসরের অনেক সাধারণ লোকই যে কোনোভাবেই হোক দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে দেশের আয়ের অন্যতম উত্স পর্যটন খাত ধ্বংসের মুখোমুখি। নিরাপত্তার কথা ভেবে বিদেশি পর্যটকরা মিসরকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে নির্বাচনের পরেও সেখানে শান্তি আসবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তারপরেও এ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ইইউ। এবং ধরে নেয়া হচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা বলবে, নির্বাচন ছিল অবাধ ও নিরপেক্ষ। তবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, অধিকাংশ দেশ ও সংগঠন এ নির্বাচনে নাও পাঠাতে পারে তাদের পর্যবেক্ষক। কেমন হবে মিসরের আসছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং তাতে কী ঘটবে, সে সম্পর্কে বেশ ভালই ধারণা জন্মেছে তাদের। সংবিধান সংশোধনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ভোটে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন পড়েছিল খুব কম লোকেরই। যারা কেন্দ্রে যাননি তারা ঠিকই জানতেন যে, তাদের যাওয়া-না যাওয়ায় কিছুই যায় আসে না; ফলাফল নির্ধারিতই। এমনটিই হয়তো ঘটবে ৩০ জুনের নির্বাচনেও।