করের আওতা বাড়ানোর বিকল্প নেই

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২০
আগামী অর্থবছরের বাজেটে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিরা। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তারা বলেন, প্রবৃদ্ধির হার ৭ বা ৮ শতাংশে উন্নীত করতে হলে সরকারের আয় বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তবে স্কুল কলেজ এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি আন হ্যাপী। এই পদ্ধতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। দেশে ২৬ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার মধ্যে অধিকাংশই ভুঁইফোড়। উত্তরাঞ্চলে এমনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে শিক্ষক ৫ জন আর শিক্ষার্থী ৫ জন।’ আগামীতে এমপিও ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আসছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসাবে গতকাল রবিবার আগারগাঁওস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের সাথে আলোচনা করেন অর্থমন্ত্রী। এসময় তাদের বিভিন্ন বক্তব্যের পেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেকে হটাত্ করে একটা স্কুল দিয়ে দিল, এর পরে এমপিও করে দেয়ার জন্য আন্দোলন করে। এজন্য এলাকার প্রাপ্ততার ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসময় তিনি আরো জানান, ঢাকার ভেতরে নতুন কোন শিল্প গড়তে দেয়া হবে না। পাট খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি জানানো হলে তিনি তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ভর্তুকি দেয়া হলেও কোন লাভ নাই, পাটে আমরা রয়েছি খামাখা। প্রাক বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, একে এম রহমতউল্লাহ, রমেশ চন্দ্র সেন, ফারুক খান, আলী আশরাফ, ইমরান আহমেদ চৌধুরী, ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী, নুরুল মজিদ মাহমুদ, মুন্নুজান সুফিয়ান, এবি তাজুল ইসলাম, আফসারুল আমিন বক্তব্য রাখেন। বাজেট বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে দুই লাখ কোটি টাকার মতো। আমরা রাজস্ব বাড়াতে চাই। বাজেট হবে বাস্তববাদী। সরকারি ব্যয়ের আকার মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ১৭-১৮ শতাংশে রয়েছে। আমরা এটি ২০ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই। বিগত বছরগুলোতে বিদ্যুত্ খাতে গুরুত্ব দেয়া হলেও এবার গুরুত্ব দেয়া হবে মানবসম্পদ খাতে। তিনি বলেন, ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঘাটতি হচ্ছে। কোথাও একটা সমস্যা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরের বাইরে শিল্প-কারখানা করা হলে তাদেরকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। ঢাকা শহরে শিল্প-কারখানা করার ক্ষেত্রে সবাইকে নিরুত্সাহিত করতে চাই। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানান তিনি। জেলা বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের কেন্দ্রে পরিণত হবে জেলা পরিষদ। জমি দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার ঢাকা শহরে জমির দাম বাড়ানো হবে। তবে বাজার দরের চেয়ে তা কম হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। আলোচনায় অংশ নিয়ে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, দেশ থেকে পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করছেন। এর বিরুদ্ধে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী বাজেটে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন কর এলকা বাড়াতে হবে। শুধুমাত্র পরোক্ষ কর দিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব নয়, প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থ পাচার হচ্ছে, মালয়েশিয়া, দুবাইয়ে বাড়ি কেনা হচ্ছে, কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। গোয়েন্দা বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআরসহ পুলিশের এ জন্য বিশেষ কৌশল থাকা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন। তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ তার বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কর্মসূচি তৈরির তাগিদ দিয়ে বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ কারণে রংপুর, দিনাজপুরের মতো জেলায় গার্মেন্ট শিল্প পল্লী গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো দেশ আমাদের থেকে এগিয়ে গেলেও আমরা পারছি না। এর কারণ হলো আমাদের ঐক্য নাই, আমাদের ধৈর্য নাই। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান বলেন, দেশের ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। পর্যটন বিভাগের অধীনে দেশব্যাপী ৩৭টি স্থাপনায় ১০ হাজার একর জমি রয়েছে, কিন্তু তার যথপোযুক্ত ব্যবহার নাই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলী আশরাফ বলেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিটি জেলায় কারিগরি শিক্ষার প্রসারে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্নুজান সুফিয়ান বলেন, পাট শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। এর বিপরীতে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা খামাখা পাটের পেছনে আছি। আমাদের দেশ থেকে পাট চলে গেছে তার মূল কারণ আন্তর্জাতকি, এতে আমাদের কোন ভূমিকা নেই। এখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হলেও কোন লাভ নাই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম তার বক্তব্যে প্রবাসীদের কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধির আহবান জানিয়ে বলেন, যারা অশিক্ষিত শ্রমিক তারাই দেশে বেশি টাকা পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে যারা শিক্ষিত উচ্চ বেতনে বিদেশে চাকরি করে তারা টাকা দেশে না পাঠিয়ে বিদেশে সম্পদ গড়ছে। এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন করের আওতা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি জনবল সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।