ছয় জেলায় নিহত ২০

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫৩
গত রবিবার রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানে। এতে একই পরিবারের চারজনসহ নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নওগাঁ, টাঙ্গাইল ও পাবনা জেলায় কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে কয়েকশ’ আহত ছাড়াও প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, রাত ১১টার দিকে নেত্রকোনার চার উপজেলার উপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এতে একই পরিবারের চারজনসহ ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হয় কমপক্ষে দুই শতাধিক। ঝড়ে ৮ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। গুরুতর আহতদের স্থানীয় হাসপাতাল ছাড়াও নেত্রকোনা এবং ময়মনসিংহ হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয়েছে। নিহতরা হলেন কলমাকান্দা উপজেলার একই পরিবারের আ. মোতালেবের স্ত্রী আফরোজা আক্তার (৩২), পুত্র সাগর (১০), জনি (৪) ও রানা মিয়া (৭), একই উপজেলার নাজিরপুরের দিপ্তী বেগম (৩৫), নয়ানগরের মাসুম (১১), রানীগাঁওয়ের আবুলেন্নেছা (৪৫), নেত্রকোনা সদরের মসজিদের ইমাম ফজর আলী মুন্সী (৭০), মোহনগঞ্জ উপজেলার সোমা আক্তার (৯), বারহাট্টা উপজেলার গাভারকান্দা গ্রামের আব্দুস ছোবহানের পুত্র এনামুল হক (১৪) ও পশ্চিম ছালিপুরা গ্রামের আব্দুল কুদ্দুছের স্ত্রী রেজিয়া খাতুন (৪২)। ওই চার উপজেলার প্রায় ২৫ গ্রামে ঝড় আঘাত হানে। ঝড় শুরু হবার সাথে সাথে বিদ্যুত্ চলে যায়। গতকাল সোমবার বিকালে জেলা শহরে সীমিত আকারে বিদ্যুত্ চালু করা হলেও ১০ উপজেলা এখনো অন্ধকারে রয়েছে। কলমাকান্দা সংবাদদাতা জানান, পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে আব্দুল মোতালেব এখন পাগলপ্রায়। স্ত্রীসহ তিন সন্তান ঝড়ে মারা যাওয়ায় তিনি এখন অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। লাশ দাফনের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে তাকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ঝড়ে উপজেলায় ৩ হাজার বাড়ি, ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। ২০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া ঝড়ে স্থানীয় আব্দুর রশিদের ২৫শ’ মুরগী মারা যায়। কলমাকান্দার সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান। বারহাট্টা সংবাদদাতা জানান, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী প্রবল ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে উপজেলার ৭ ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ঝড়ে ২ জন নিহত ছাড়াও আহত হয়েছে প্রায় ৫০ জন। ৫ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। হাজার হাজার গাছ উপড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বারহাট্টা সদর, আসমা, চিরাম, বাউসী, সিংধা ও রায়পুর ইউনিয়নে। বারহাট্টা মডেল স্কুল মোড়ে শত বছরের পুরাতন বটগাছটি উপড়ে গিয়ে একটি মার্কেটে পড়লে প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। সিলেট অফিস জানায়, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে রবিবার মধ্যরাতে কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের সময় সিলেটের কানাইঘাটে একজন ও সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় চারজনসহ মোট ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরা হলেন কানাইঘাট উপজেলার গুরতপুর গ্রামের আলফাসুন্নেছা (৫৫), ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের শামসু মিয়া (৬৫), বীথি (১০), কাছু মিয়া (৪০) ও মধ্যনগরের দুদু মিয়া (৬৫)। ঝড়ের কবলে পড়ে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। বহু বাড়িঘর, গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে গেছে। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের টিনের চাল উড়ে গেছে। কোন কোন স্থানে পাকা দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। মাঠের পাকা বোরো ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, বিভাগের শতাধিক হেক্টর বোরো জমি ঝড়ে আক্রান্ত হয়েছে। রবিবার রাত থেকে সোমবার বেলা ৪টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন স্থানে এবং জেলা ও উপজেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ঝড়ে সিলেট সদর, ছাতক, বিশ্বনাথ, জগন্নাথপুর, দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা এলাকায় শত শত কাঁচা ঘরবাড়ির চাল উড়ে গেছে বা বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে লোকজন জানান, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব ছিল ভয়াবহ। সিলেট আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যাবেক্ষক অমিত হাসান জানান, রবিবার রাত ১২টা ৪৮ মিনিট থেকে ১২টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বয়ে যাওয়া ঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৮২ কিলোমিটার। নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, ঝড় চলাকালে বজ্রপাতে জেলায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাত ১১টার দিকে ঝড় শুরু হয়। এসময় শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় একটি ঘরের ছাউনি উড়ে গেলে আতংকিত হয়ে ঘরে থাকা আবু ইসা (১৪) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। আবু ইসা ওই এলাকার চকবিরামচন্দ্র গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে। এছাড়া পত্নীতলায় জমিতে সেচ দেয়ার সময় বজ্রপাতে মাহমুদুল ইসলাম (২৮) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মাহমুদুল উপজেলার শীতল গ্রামের হাইয়ুমুদ্দীনের ছেলে। মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের সময় ইটের চাপায় রাজীব (১২) নামে এক শিশু মারা গেছে। তার পিতার নাম মো. আবেদ আলী, গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলায়। নিহত রাজীব মির্জাপুর সদরের বিশ্বরোড বাইপাস এলাকায় এক কাঠের দোকানে শ্রমিকের কাজ করতো। দোকানের অপর শ্রমিক মিজান জানায়, কাজ শেষ করে রাতে তারা ঘুমিয়ে ছিল। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলে আধাপাকা ঘরের উপরে থাকা সাইন বোর্ডের ইটের পিলার ভেঙ্গে রাজীবের বুকের উপর পড়ে। ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় রাজীবের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে । বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ের সময় উপজেলার মোহনগঞ্জে বজ্রপাতে ফরহাদ (১৪) নামের এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার গভীর রাতে ভাই ফরিদের সঙ্গে পদ্মায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে দুজনের শরীর পুড়ে যায়। তাত্ক্ষণিক স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া হলে ডাক্তার ফরহাদকে মৃত ঘোষণা করেন। ফরিদের অবস্থাও আশংকাজনক বলে জানা গেছে। এছাড়া রবিবার মধ্যরাতে নীলফামারী, মৌলভীবাজার, পনচগড়, ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলার বেশকিছু উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ফসলের ক্ষতি হওয়ার খবর দিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।