সাতজন এখনো নিখোঁজ

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০২
একের পর এক অপহরণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের মানুষ। সর্বশেষ গত রবিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জন অপহূত এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ দুজন নিখোঁজ হয়। গতকাল সোমবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কারো খোঁজ মেলেনি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আইনজীবী চন্দন সরকারের মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করে দেখেছে সর্বশেষ রবিবার সন্ধ্যার পর তার অবস্থান ছিল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায়। তারপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ। আর অপহূত হওয়ার পর থেকেই ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। নজরুল ইসলামের স্ত্রী বিউটি গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াছিন ও সিনিয়র সহ-সভাপতি নূর হোসেনসহ ছয় জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত ছয়-সাত জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। নজরুলের সমর্থকরা গতকাল নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এসময় তারা বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। অবরোধের সময় মহাসড়কের দশটি স্পটে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে অবরোধকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশ কয়েকটি টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। তবে পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছে। এসময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে দুপুর সোয়া ১টায় অবরোধ তুলে নেয় অবরোধকারীরা। অপরদিকে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক নিখোঁজ হওয়ার প্রতিবাদে গতকাল দলমত নির্বিশেষে সকল আইনজীবী একত্রিত হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড অবরোধসহ পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করেন। এসময় তারা চন্দন সরকারকে উদ্ধারের জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীকে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুমকি দেন তারা। আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রবিবার দুপুরে আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে ফতুল্লায় স্টেডিয়ামের কাছে ৮/১০ জনের একটি গ্রুপ প্যানেল মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে বহনকারী প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৯১৩৬) থামিয়ে তাকেসহ ৫ জনকে অপহরণ করে। নজরুলের স্ত্রীর দাবি অপহরণকারীরা নিজেদের র্যাব সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িতে থাকা নজরুল ইসলাম, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সহ-সভাপতি তাজুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী মনিরুজ্জামান ওরফে স্বপন এবং তার বন্ধু লিটনকে তুলে নিয়ে যায়। পরে রাতে তাদের ব্যবহূত প্রাইভেটকারটি গাজীপুর থেকে উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে আইনজীবী চন্দন সরকারের ভাতিজা অ্যাডভোকেট অরুনাভ সরকার ফতুল্লা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, আদালতে কাজ শেষে চন্দন সরকার তার গাড়ি নিয়ে (ঢাকা মেট্রো গ ২৭-৩৩৩৭) জালকুড়ি বৃষ্টিধারায় বাসায় ফিরছিলেন। তার গাড়িটি ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের (অপহূত হয়েছেন) গাড়ির সামনেই ছিল। স্টেডিয়াম এলাকায় আসার পর থেকে চন্দন সরকার ও তার চালকসহ গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল ফোনও বন্ধ। অরুনাভ ধারণা করেন তার চাচা অপহূত হয়েছেন। কেউ তাকে অপহরণ করেছে। কি কারণে তার চাচাকে অপহরণ করা হয়েছে তা তিনি জানেন না। চন্দন সরকার অপহরণের প্রতিবাদে গতকাল নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান, সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান দিপু, আবদুল বারী ভুঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা প্রমুখ। সমাবেশে আইনজীবীরা বলেন, নারায়ণগঞ্জ এখন খুন-গুমের নগরীতে পরিণত হয়েছে। আইনজীবীদেরও নিরাপত্তা নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত চন্দন সরকারকে উদ্ধার করা না হবে ততক্ষণ তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। পরে আইনজীবীরা আধাঘন্টার জন্য ঢাকা-নারায়ণঞ্জ লিংকরোড অবরোধ করেন। আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধি দল পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের সাথে দেখা করে চন্দন সরকারকে উদ্ধারের জন্য ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। পুলিশ সুপার তাদের জানান, চন্দন সরকারকে উদ্ধারে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এদিকে অপহূত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি গতকালও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে তার স্বামীকে উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করেন। পরে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্থানীয় বিরোধের জের ধরে র্যাব দিয়ে তার স্বামীকে গুম করানো হয়েছে। এ ঘটনার সাথে জড়িত বলে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াছিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি নূর হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল, হাসু, রাজু, আনোয়ারসহ ১০/১২ জনের নাম উল্লেখ করেন। গতকাল রাত আটটায় সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নূর হোসেন, মো. ইয়াছিন, ইকবাল, হাসু, রাজু ও আনোয়ারসহ অজ্ঞাত আরো ৬-৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আসামিরা র্যাব পরিচয়ে নজরুলকে অপহরণ করে। প্রসঙ্গত, অপহূত নজরুল ইসলাম নিজেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক ইত্তেফাককে বলেন, অপহূতদের উদ্ধারে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডে পুলিশি টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। আর পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, অপহরণকারীদের গ্রেফতার ও অপহূতদের উদ্ধারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করে চলেছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরাও অপহূতদের উদ্ধারে মাঠে নেমেছে বলে জানা গেছে।