দুই প্রজন্মের কাছে চিত্রনায়িকা রূপে একমাত্র মৌসুমীই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছেন। মৌসুমী ও ওমর সানির সন্তান স্বাধীনও এরইমধ্যে নাম লিখিয়েছেন চলচ্চিত্রের খাতায়। তবে পর্দার সামনে নয়, পর্দার পেছনে। একজন পরিচালক হিসেবে হাজির হচ্ছেন তিনি ঢালিউডে। স্বাধীনের প্রথম পরিচালনার চলচ্চিত্রে কাজ করতে যাচ্ছেন তারই মা মৌসুমী। তাদের তিন জনের চলচ্চিত্র ভাবনা ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন রবি হাসান ও ছবি তুলেছেন জাকি বাংলা
এ দেশে চলচ্চিত্র তারকাদের সন্তানদের বড়পর্দায় আসার খুব একটা নজির নেই। আর যে ক’টি উদাহরণ রয়েছে সেখানে দেখা যায় নায়ক বা নায়িকার ভূমিকায় সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট থাকেন তারা। এই বাস্তবতায় ফারদীনের ক্যারিয়ার পর্দার পেছনে গড়তে আগ্রহী হয়েছেন মৌসুমী-ওমর সানি তারকা দম্পতি। এ প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘আমাকে বা ওমর সানিকে তারকা বানিয়েছেন পরিচালকরাই। আমরা কাজের প্রতি ভালোবাসা ও নিষ্ঠা দেখিয়ে আজকের এই অবস্থানে এলেও এর মূল কৃতিত্ব কিন্তু পরিচালকদেরই। আমাদের সেরাটুকু উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন তারাই। তাই আমি ও সানি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমাদের ছেলেও একজন তারকা বানানোর কারিগর হিসেবেই চলচ্চিত্রাঙ্গনে যুক্ত হবে। আমাদের ইচ্ছে পরিচালকরা যেমন একজন মৌসুমী-ওমর সানিকে তৈরি করেছেন, তেমনি ফারদীনও আগামী দিনের তারকা তৈরি করবে। এ ছাড়া একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার উপরই ছবির সাফল্য অনেকখানি নির্ভর করে। ফারদীন একজন সফল পরিচালক হিসেবে এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই আমাদের ইচ্ছে। আর এই মুহূর্তে আমাদের শিল্পে তরুণ পরিচালকদের খুবই প্রয়োজন। আমরা তাকে সৃজনশীল একজন পরিচালক হতে উত্সাহিত করছি।’ এ কথা সুতো ধরে ফারদীনের বাবা ওমর সানি বলেন, ‘হ্যাঁ, মৌসুমীর কথার সঙ্গে আমি একমত। অভিনয়শিল্পী হিসেবে পর্দার সামনে থেকে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছি, তার জন্য দর্শকদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর আমাদের ছেলে ফারদীনের পর্দার সামনে কাজ করার ইচ্ছে তেমন নেই। সে চায় ক্রিয়েটিভ কিছু করতে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এ প্রজন্মের ছেলেরা বেশ এগিয়ে, যা আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য খুবই প্রয়োজন। সেদিক থেকে স্বাধীন (ফারদীন) অনেকটাই এগিয়ে, নিয়মিতই চর্চা করছে। ভিডিও এডিটর হিসেবে তার দক্ষতাও বেশ। চলচ্চিত্র পরিচালনার উপরে সে প্র্যাকটিক্যালি অনেক কিছু শিখেছে। খুব শীঘ্রই আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে পড়তেও যাবে এ বিষয়ে। আমরা চাই এ দেশের চলচ্চিত্রে শিল্পে একজন মেধাবী পরিচালক উপহার দিতে, যে কিনা দেশকে অনেক ভালো চলচ্চিত্র উপহার দিতে পারবে।’ তবে শুরুতে ফারদীনের ইচ্ছা ছিল না শোবিজে আসার। তার ইচ্ছে ছিল পাইলট হওয়ার। কিন্তু শোবিজের এত বড় স্টারের সন্তান হওয়ায় তাকেও শোবিজেই আসতে হয়। এ প্রসঙ্গে ফারদীন বলেন, ‘আসলে শুরুতে আমার শোবিজ মিডিয়া নিয়েই তেমন কোনো লক্ষ্য ছিল না। নায়ক কিংবা পরিচালক—কোনোটাই আমাকে আকর্ষণ করেনি। আমার ইচ্ছে ছিল পাইলট হওয়ার। কিন্তু ধীরে ধীরে সবকিছু বুঝার পর ভাবলাম যে পরিচালনায় যাই, দেখি নিজের জায়গা থেকে নিজের মেধা দিয়ে ভালো কিছু করতে পারি কি না। যদি ভালো কাজ দর্শকদের উপহার দিতে পারি তাহলে আমি এই পেশায় নিজেকে নিয়মিত করব। ভালো ভালো চলচ্চিত্র যেন দর্শকদের উপহার দিতে পারি, তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিই আমি গ্রহণ করছি। আমাদের নিজেদের প্রোডাকশন হাউজ ‘স্বাধীন প্রোডাকশন’-এর অনেক নাটকের কাজ করেছি। এসব কাজ দিয়ে নিজেকে ঝালাই করে নিচ্ছি। বেশ ক’জন দক্ষ চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গেও কাজ করেছি। তাই ক্রমেই কাজ করার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।’
বিগত দিনগুলোতে আমাদের চলচ্চিত্রের বেহাল দশা থাকলেও দিনকে দিন বেশ উন্নত হচ্ছে। তাই দর্শকরাও ধীরে ধীরে সিনেমা হলে ফেরা শুরু করেছেন। ভালো চলচ্চিত্রের অপেক্ষায় আছেন তারা। সেদিক থেকে গত কয়েক বছরে বেশ ক’জন তরুণ নির্মাতা সফলতার ছোঁয়াও পেয়েছেন। আর তরুণদের কাজ দেখে দর্শকরাও আশায় বুক বেঁধেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে ফারদীন বলেন, ‘সবারই ইচ্ছা থাকে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমি আমার জায়গা থেকে যতদূর সম্ভব করব। আর চলচ্চিত্রের ধরনের বেলায় বলব, আমি পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই। কমেডি, অ্যাকশন, রোমান্স এবং আর্টও হতে পারে। তবে আমার মতে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র মানে এই নয় যে, ৫টি গান, ৪টি মারপিট, ‘সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ ধরনের এন্ডিং। চলচ্চিত্র শুরুর আগে এগুলোকে মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে ধরে নিলে কখনও ভালো গল্প দাঁড়াবে না। আমি অবশ্যই চেষ্টা করব ভালো গল্পের উপর নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে।’
তবে মজার বিষয় হলো, শুধু ফারদীনই নয়, তার মা মৌসুমীও এবার পরিচালনায় আসছেন। ‘শূন্য হূদয়’ শিরোনামের এই চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা করছে ইমপ্রেস টেলিফিল্মস। এরইমধ্যে প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন তারা। এই ছবিতে মৌসুমী নিজে অভিনয়ও করছেন। আর যেহেতু ছবিটির পেছনে থাকার পাশাপাশি পর্দার সামনেও থাকছেন মৌসুমী তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ছেলের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র এটিই হতে যাচ্ছে, যদিও তিনি প্রধান সহকারী পরিচালকের ভূমিকায় রয়েছেন। নিজের সন্তানের পরিচালনায় কাজ করা প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘এটি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের একটি চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের নাম ‘শূন্য হূদয়’। আমি পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয় করছি, তাই মূল পরিচালনার কাজটা ফারদীনই করবে। সেই হিসেবে আমার ছেলের পরিচালনার প্রথম ছবিতে আমি কাজ করতে যাচ্ছি। আর এই বিষয়টা আমি বেশ উপভোগ করছি। দারুণ লাগছে! এতদিন বহু পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি। দেশের প্রায় সব কিংবদন্তি ও সেরা পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছি আমি। এবার কাজ করব নিজের সন্তানের পরিচালনায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন মা হিসেবে গর্ব করার মতো বিষয় এটি।’ অন্যদিকে ফারদীন বলেন, ‘হ্যাঁ, বিষয়টা আমার জন্যও বেশ উপভোগ্য। তবে একটু ভয়ও আছে, কাজের বেলায় যদি না মা ধমক দেয়। দেখা যায়, স্বভাবত পরিচলকরা তাদের কাজটা ঠিকমতো আদায় করার জন্য মাঝে মাঝে ধমকও দেয় হয়তো, কিন্তু এবার বোধহয় আমাকে ধমক খেতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো—আমার মা যেহেতু দেশের শীর্ষ একজন নায়িকা, তার কাজের প্রত্যাশাও অনেক বেশি, আমি যদি পরিচালনায় সেই আউটপুটটা না দিতে পারি তো সব দোষ আমার উপরেই পড়বে। আর একজন নবাগত পরিচালক হিসেবে এর ধকলটা সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়বে। আমার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি আমার ভুলই মায়ের ক্যারিয়ারে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’ অন্যদিকে ওমর সানিও এবার বড় পর্দায় নিয়মিত হয়েছেন। এরইমধ্যে একাধিক চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছেন। তার মধ্যে ‘লিডার’ চলচ্চিত্রটি উল্লেখযোগ্য। এই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুর্দান্ত একটি গল্পের ছবি এটি। এ যাবত্ বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রে এমন সুন্দর গল্পের কাজ দেখিনি। যেমন সুন্দর চিত্রনাট্য, তেমন সুন্দর ক্যামেরার কাজ, ঠিক তেমনই সুন্দর পরিচালকের মুন্সিয়ানা।’ এই চলচ্চিত্রটির পাশাপাশি ওমর সানি আবারও মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করতে যাচ্ছেন। এরইমধ্যে এই জুটির ৫টি চলচ্চিত্রে কাজের কথা রয়েছে, হয়তো খুব শীঘ্রই এগুলোর শুটিংও শুরু হয়ে যাবে। একসময়ের হার্টথ্রব এই তারকা দম্পতি নতুন করে জুটি হিসেবে চলচ্চিত্রে ফেরা প্রসঙ্গে ওমর সানি বলেন, ‘মাঝে আমি পরিবার ও ব্যবসা নিয়ে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। আর তাই একজন নায়ক হওয়ার জন্য শারীরিক যেই গঠনের প্রয়োজন হয় সেটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমি আবার নিজেকে সেই গঠনে নিয়ে এসেছি। চলচ্চিত্র শিল্পও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। অনেক তরুণ নির্মাতা এসেছেন, তারা নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সবকিছু মিলিয়ে আমি এখন থেকে চলচ্চিত্রে পুরোপুরি নিয়মিত। আর সময়টাকে সবারই মেনে নেওয়া উচিত। আমি যদি আশির দশকের চলচ্চিত্র এখন দেখতে গিয়ে এখনকার প্রেক্ষাপটের মানসিকতা নিয়ে দেখি তাহলে হবে না। তখন আমি এবং মৌসুমী দু’জনেই বয়সে টিনেজ ছিলাম। এখন তো আমরা টিনেজার না। তাই গল্প, চরিত্র ও সময়কে বিবেচনা করে যতটুকু ভালো কাজ দেওয়া যায় সেটাই করব। এটাই আমাদের পরিকল্পনা। আর হার্টথ্রব বলতে যা বুঝায় তার সবই আমরা পেয়েছি, এখন আর আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগতভাবে পাওয়ার তেমন কিছু নেই। এখন ইন্ডাস্ট্রিকে ভালো কিছু দিতে চাই। যদি সেই ক্রেজটার কথা বলা হয়, তাহলে এটা করতে হবে নতুন যারা আছেন চলচ্চিত্রে তাদের। সেদিক দিয়ে সম্ভাবনাময়ী ছিলেন সারিকা, তিন্নী, প্রভা। কিন্তু তারা ঠিক জানি না কেন যেন নিজেরাই নিজেদের সেই ভবিষ্যতকে গলাটিপে মেরেছেন। তবে সেই ক্রেজটা তৈরি করার জন্য নতুনদেরই হাল ধরতে হবে। আমি আর মৌসুমী নতুন প্রায় ৫টি ছবিতে কাজ করতে যাচ্ছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দর্শকরা আমাদের একসাথে পর্দায় পাবেন।’ ওমর সানিকে আবারও হয়তো দর্শকদের সামনে নতুন করে হাজির করতে খানিকটা কষ্ট হবে, কিন্তু সেদিক থেকে কোনো ঝামেলা নেই মৌসুমীর বেলায়। কেননা, শাবানা-ববিতার পর যদি শীর্ষ নায়িকাদের বেলায় কারও নাম আসে তাহলে শাবনূর-মৌসুমী। যদিও বিগত বছরগুলোতে শাবনূর তার কাজের সেই ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখতে পারেননি। যেখানে মৌসুমী একেবারেই অটুট। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘আমরা কখনোই শাবানা-ববিতার মতো এতটা জনপ্রিয় হতে পারব না। শাবানা আপু যদিও এখন অভিনয় করেন না, তবে এখনও আমার আদর্শের মানুষ তিনি। আমার জায়গা থেকে বলব যে, চলচ্চিত্রকে আমি সবসময় নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি। একজন চলচ্চিত্রের মৌসুমী শুধুই একজন চলচ্চিত্রের মৌসুমী। তাকে কখনোই চলচ্চিত্রে থেকে ভিন্নভাবে দেখা যাক আমি তা চাইনি। এমনকি মাঝে মাঝে আমি নিজেও মৌসুমীর ভক্ত হয়ে যাই। আর এটাই আমাকে চলচ্চিত্রের প্রতি আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আরও বেশি দায়িত্বশীল, কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান করে তুলেছে। তবে মাঝে একটা সময় গিয়েছিল যা আমাদের সবার জন্যই ছিল খুবই বিষাদময়। চারিদিকে শুধু অশ্লীল আর অশ্লীল, তখন একটা নায়কের হাত ধরতেও খুব ভয় লাগত। দেখা গেল হাত ধরলাম আর ওই ফ্রেমের মাঝখানে কাটপিস ঢুকিয়ে দিল। অনেকসময় এই জঘন্য কাজটা পরিচালকরা না করলেও হলের মধ্যেও করা হতো। এখন আমাদের চলচ্চিত্র সেই জায়গা থেকে উতরে এসেছে। এবং আমি মনে করি যে, আমাদের দেশের দর্শকেরা বিদেশি চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রকে ভালোবাসে। তারা আমাদেরকে ভালোবাসে। তারা ভালো চলচ্চিত্র দেখতে চায়, আর তাদের এই চাওয়ার জন্যই কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প এতটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’ উল্লেখ্য, ওমর সানি তার স্বাধীন প্রোডাকশনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন ফারদীনকে দিয়ে দিয়েছেন।
