দেশের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে অবস্থান করছে। তীব্র দাবদাহের কারণে পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। শহরের ৯৫ শতাংশ নলকূপেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না। খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই আমরা এসব দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। ঋতু-বৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়া আর শীতের সময় প্রচণ্ড শীত, গরমের সময় প্রচণ্ড গরম এসব জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে শীর্ষে। ধারণা করা হচ্ছে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ডুবে যাবে। অনেক মানুষ হয়ে পড়বে উদ্বাস্তু। সুপেয় পানির তীব্র অভাব দেখা দেবে। এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতেই আমরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বো।
বেপরোয়া কার্বন নির্গমন চলতি শতকে সংঘাত, অনাহার, বন্যা ও অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়াবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে সম্পদ ও বাসস্থান বিনষ্টের কারণে ক্ষতি হবে ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তাপমাত্রা প্রতি ডিগ্রি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু রক্ষায় ব্যয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকবে।
উষ্ণায়ন এভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে তা গুরুতর, স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় প্রভাব ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা বৃদ্ধি, শস্যের ফলনে পরিবর্তন ও পানির প্রাপ্যতার সংকট ব্যাপক মাত্রায় দেখা দেবে। এসব পরিবর্তনের কিছু কিছু হয়তো মানুষ সয়ে নেবে। তাতেও সীমাবদ্ধতা থাকবে। জলবায়ুর পরিবর্তনে দেশে দেশে অস্থিরতা ও সংঘাত দেখা দেবে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়া স্থানগুলো থেকে অভিবাসন এবং খাদ্য ও পানির কারণে এসব সংঘাতের সূত্রপাত হবে।
গত কয়েক বছরে আমাদের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়েছে। আইলা-সিডরের মতো দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। গত ৫ বছর আগে বয়ে যাওয়া সিডরের আঘাতে এখনো সে এলাকার মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এ থেকেই বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের সামনে আমরা কতোটা অসহায়। সিডর এলাকায় এখন পর্যন্ত একটা টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা যায়নি। সবার জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করা যায়নি গত ৫ বছরেও। দিন দিন আমাদের বিপন্নতা বাড়বে এতে আর সন্দেহ কী। এই অবস্থায় এসব দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষ আগাম সতর্ক ব্যবস্থা জোরদার করা, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও দুর্যোগ পরবর্তী ত্রাণ-পুনর্বাসন কাজে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা আমাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ন্যায্য দাবি। এটাও কারো অজানা নয় যে, পরিবেশ বিপর্যয়ে দায়ী উন্নত বিশ্বই। অথচ এর পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। অকাল বন্যা-প্লাবন, খরা-মরুময়তা আর প্রচণ্ড শীতে বিপর্যস্ত করছে জনজীবন। সারা বছরই আমাদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
যেহেতু বর্তমানে জলবায়ু পরিবতন একটি বৈশ্বিক ইস্যু এবং এর পেছনে উন্নত বিশ্ব অনেকাংশই দায়ী তাই তারা সেই দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড হতাশাজনক। তারা কার্বন নিঃসরণ কমাবে না, আবার ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণও দেবে না। এভাবে চলতে পারে না।
সারাবিশ্বে উষ্ণায়নবিরোধী জনমত প্রবল হওয়া সত্ত্বেও শুধু আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার কারণে ৩৯টি দেশ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর ওপর জলবায়ু সন্ত্রাস চালাচ্ছে। পাশাপাশি লাগামহীনভাবে কার্বন নির্গমন করা দেশগুলোও ক্রমশ এ বিশ্বকে উত্তপ্ত করে তুলছে। উন্নত দেশগুলোর অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে ইতিমধ্যে বায়ুমণ্ডলের যে ক্ষতিসাধন হয়েছে, বাংলাদেশকে তার কুফল পুরোটাই ভোগ করতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যাতে তার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
ঢাকা
