গাছের প্রাণ আছে এটা কি আর নতুন কথা? এটা তো বিক্রমপুরে বাড়ি, রাঢ়িখাল গ্রামের উদ্ভিদবিজ্ঞানী কবেই আবিষ্কার করে গেছেন এবং এটার সত্যতা সম্পর্কে দিয়ে গেছেন অনেক প্রমাণ। কিন্তু গাছের যে ভালোবাসা আছে এমন প্রমাণ তো দিয়ে যাননি। একথা হয়তোবা সত্য—ভালোবাসা অনেকেই দিতে জানে না। এটা অত্যন্ত কঠিন বস্তু। আপন ভাই-ই যেখানে ভালোবাসতে পারে না সেখানে একে অপরকে ভালোবাসবে কী করে?
কিন্তু একটি গাছ তার নিজের দেহের ওপর বেয়ে বেয়ে উঠতে দেয় লতাগুলোকে। এরা বড় হয়ে গাছটিকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে। এমনকি এক পর্যায় মেরে ফেলে। সিলেটের বড়লেখায় এ ধরনের একটা লতা আছে, যাকে উজাড়ি লতা বলে। আমাদের ছোটবেলায় এ লতা কখনো দেখিনি। আমাকে একদিন জের আলী বলে—এটা ভারত থেকে এসেছে বলে এটাকে রিফিউজি লতা বলে। আরো বলে ওরা অমর। শিকড় তুলে ফেললেও আবার উঠে আসল গাছটাকে মেরে ফেলে। আমি বললাম—এটা তো খুব খারাপ কথা। উপকারীর উপকার স্বীকার তো করেই না আবার উপকারীকে মেরে ফেলে!
এরপর থেকেই আমার নিজ হাতে লাগানো গাছগুলোকে ভালোবাসতে লাগলাম। এখন গাছগুলো অনেক বড় হয়েছে। আমি ঢাকায় থাকি বাধ্য হয়ে যদিও প্রত্যেকে কর্মজীবন শেষে গ্রামের পূর্বপুরুষের বাড়িতে থাকে; কিন্তু আমার সে সুযোগ হচ্ছে না। এমপি থানা মাতবর সবাইকে বলি কেউ একটু দাদার স্মৃতি পুরনো ঘরে থাকার জায়গা দেয় না, ওরা যতই বাধ সাধছে ততই আমার গাছগুলোর প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে। ঢাকায় থেকে গাছের পাতার পতপত শব্দ শুনি, দেখতে পাই তাদের ডগডগ করে বেড়ে ওঠা। শংকিত থাকি উজাড়ি লতা কি আমার প্রিয় গাছগুলোকে উজাড় করে দিচ্ছে?
গাছের ভালোবাসা আরও মারাত্মক। সে মায়ের শাড়ি দিয়ে আমাকে ঢাকার মতোই করে রাখছে তাই নয়, গাছ বাগানে গেলে আমার গায়ে এক চিলিক রোদ তো লাগেই না মাঝে মাঝে ছোট ছোট নানা ফল ফেলে দেয় সুদূর ঢাকা থেকে গেছি বলে। বাড়িতে আমার ভাতের ব্যবস্থা না থাকলেও গ্রামের লোকজন এক একদিন এক একজন খাওয়ায়, তবে প্রথম খাদ্যটা পাই আমার লাগানো আমার শুশ্রূষা পেয়ে বড় হয়ে ওঠা গাছগুলোর কাছ থেকে। আপন মনে ভাবি জগদীশ বাবু বিজ্ঞানের চোখে দেখেছেন গাছের প্রাণ আছে, কিন্তু সাহিত্যের চোখে দেখেননি গাছের ভালোবাসা আছে।
ঢাকা
