গুম, খুন ও অপহরণ প্রতিরোধে সারাদেশে সাংগঠনিক ‘রেড এলার্ট’ ঘোষণা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বিএনপিসহ ১৯ দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের অপহরণ ও খুনের ঘটনায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে হাসিনা কেন অপহূতদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নিলেন না। ৭ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেল। এই হত্যার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হাসিনা ও সরকারকে নিতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। শ্রমিক দল এই গণজমায়েতের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম খান, আবদুল্লাহ আল নোমান প্রমুখ সমাবেশে বক্তব্য দেন।
দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, কাউকে ছেড়ে দেয়া যাবে না। সে পুলিশ হোক, র্যাব হোক, হোক আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী। সবাইকে ঘেরাও করে ফেলবেন। নির্দোষকে ছিনিয়ে আনবেন, আর দোষীকে আইনে সোপর্দ করবেন। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে সারাদেশে রেড এ্যালার্ট জারি করা হলো। তিনি অভিযোগ করেন, এসব খুন, গুমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজনই জড়িত। আওয়ামী লীগের দুর্নীতির কারণে পুলিশ বিভাগের চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। তারা পুলিশকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
৪৮ মিনিটের বক্তব্যে খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সময় থাকতে সাবধান হন। বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠলে রেহাই পাবেন না। এখনও সময় আছে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। আলোচনা করুন। এই অবৈধ সংসদ ভেঙ্গে দিন। না হলে রেহাই পাবেন না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ আজ অবরুদ্ধ। সারাদেশকে এই অবৈধ সরকার আজ একটি কারাগারে পরিণত করেছে। দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এই অবৈধ সরকার।
খালেদা জিয়া বলেন, তাদের কথায় দেশের মানুষ ৫ জানুয়ারি ভোট দিতে যায়নি। কেন্দ্রে কোনো পুলিশও ছিল না। ছিল কিছু কুকুর। তাহলে কি ভূত ও জিনে এদের ভোট দিয়েছে? এই সরকার হচ্ছে ভূত ও জিনের সরকার। তাই এ অবৈধ সরকার জনগণের সমর্থনে নয়, এটা একটি একদলীয় সরকার। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্য জনগণকে ভয় পেয়ে চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে সংবিধান বদল করেছে। কিন্তু আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিতে চাই, দেশের মানুষ যখন জেগে উঠবে তখন এই সংবিধান তাদের রক্ষা করতে পারবে না। আজ কিছু নমুনা দেখা যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ তার উদাহরণ। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার জন্য আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসিনাকে জবাব দিতে হবে।
বিএনপি নেত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ড্রাকুলার সরকার। আওয়ামী লীগের হাতে দেশের মানুষ নিরাপদ নয়। দেশও নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগের ৫ বছরে দুই লাখ তাঁত বন্ধ হয়েছে। বেকার হয়েছে লাখ লাখ শ্রমিক। একদিকে আওয়ামী লীগ মানুষ খুন করছে, অন্যদিকে বেকার করছে। আজ হাজার হাজার গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই শ্রমিক-মালিকের স্বার্থেই এই অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারকে বিদায় করতে হবে। তিনি আরো বলেন, আজ শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের এমপি-মন্ত্রীরা লাভবান হচ্ছেন। কোনো টেন্ডার হচ্ছে না। তারা লুটেপুটে খাচ্ছেন। আজ ৩শ’ এমপির মধ্যে ২২৬ জন কোটিপতি হয়েছেন। ৪২ জন কোনো ট্যাক্স দেন না। পুকুর চুরি হচ্ছে। এরা হচ্ছে চোর ও খুনির সরকার।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পর্ক রয়েছে। জেএমবির আ. রহমান মির্জা আজমের দুলাভাই। ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে জঙ্গিদের কারা অপহরণ করেছে? আওয়ামী যুবলীগের নেতারা করেছে। এই জঙ্গি, দুর্নীতিবাজ, খুনিদের ক্ষমতায় রাখা যাবে না। তাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে কোনো লাভ নেই। কাজেই এখন গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমি জনগণের নিরাপত্তার দাবিতে, গণতন্ত্রের দাবিতে, মানুষের জন্য, দেশের জন্য আবারও রাস্তায় নামবো। সকলে প্রস্তুত নিন, সতর্ক থাকুন। সময় মতো ডাকলে আসবেন।
খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘রানা প্লাজায় যেসব শ্রমিক নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের কোনো সাহায্য ও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। সে সময় এই আওয়ামী লীগ দেশ-বিদেশ থেকে অনেক চাঁদা তুলেছিল। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের তা দেয়া হয়নি।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, অবিলম্বে অবৈধ সংসদ ভেঙ্গে দিন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। আলোচনায় আসুন। বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম থাকলে, দেশকে ভালোবাসলে গদি ছেড়ে নির্বাচন দিন। জনগণ যদি আপনাকে ভোট দেয়, তাহলে গদিতে বসবেন।
খালেদা জিয়ার বক্তব্যের শেষ মুহূর্তে হঠাত্ সমাবেশস্থলে বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কিছু উত্কণ্ঠিত নেতাকর্মী সমাবেশের পশ্চিম ও পূর্বদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। এ সময় সময় তিনি ঘোষণা দেন, আমাদের এই বিশাল সমাবেশে কিছু দালাল ও বেঈমান ঢুকে পড়েছে। দালালদের চ্যাপ্টা করে দেবেন। কাউকে ছেড়ে দেবেন না।
বিকাল সোয়া ৪টার দিকে খালেদা জিয়া মঞ্চে উপস্থিত হন। এ সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী শ্লোগানে শ্লোগানে নেত্রীকে স্বাগত জানান। হাত নেড়ে তিনি নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। এর আগে দুপুর থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন। সমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্সবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে।
