ভাণ্ডারিয়ায় সংবর্ধনা

দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়নে ঐক্যের বিকল্প নেই

আপডেট : ০২ মে ২০১৪, ২৩:১৭
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল শুক্রবার রাতে ভাণ্ডারিয়ায় তাকে দেয়া এক বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, উন্নয়নের প্রশ্নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলে আমার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে যা বার বার বলেছি, এখনো বলছি, ভবিষ্যতেও বলব। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। বিগত ৪৩ বছরে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে অনেক অর্জন হয়েছে। রাজনীতিতে যদি বিবাদ না থাকত, এ পথ যদি রক্তাক্ত না হতো, খুন না হতো- তাহলে এ অর্জন আরো বেশি সম্ভব হতো। যারা বয়সে তরুণ তারা অনেকেই অনেক কিছু জানে না বলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদানের প্রতি ইঙ্গিত করে মন্ত্রী বলেন, পঞ্চাশোর্ধ বয়সী আমরা সবাই জানি একজন “বংশীবাদকের” কারণেই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ঐ সময় যারা তাঁকে পছন্দ করতেন না তারাও তাঁর পক্ষে ছিলেন। ৩০ বছরের রাজনৈতিক পরিক্রমায় বরিশাল-পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য দেশের অবহেলিত অঞ্চল বিবেচনায় সাধ্য অনুযায়ী এ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। তখন যদি এ অঞ্চলের নেতারা ঐক্যবদ্ধ থাকতেন তাহলে আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আরো বেশি সক্ষম হতাম। আনোয়ার হোসেন বলেন, নৌ-পথ নির্ভর দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব তা আমরা দেখাতে পেরেছি। বলেশ্বর সেতুসহ এ অঞ্চলে যেসব সেতু-কালভার্ট-রাস্তা নির্মিত হয়েছে তা অধিবাসীদের জীবনকে বাংলাদেশের মূলধারার সাথে সংযুক্ত করেছে। আজ আবারও পিরোজপুর-ভাণ্ডারিয়াসহ উপকূল অঞ্চলে মানুষের জীবন ধারণকে সহযোগিতা করার জন্য যে দায়িত্ব পেয়েছি, তা সৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহর ইচ্ছায় এ দায়িত্ব অতীতের মত ঈমানের সাথে সাধ্যানুযায়ী সম্পাদন করার চেষ্টা করব। এ অঞ্চলে যাতে বেশি কাজ করা যায় তার জন্য এলাকার নেতৃবৃন্দ ও মানুষের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে ঐক্য-স্থিতিশীলতা-শান্তি না থাকলে মানুষ অধিকার বঞ্চিত থাকে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম এ আউয়াল বলেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শুধু ভাণ্ডারিয়া-পিরোজপুরের নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের নেতা। অতীতের মত পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী হিসাবে অবদান রাখবেন। বলেশ্বর নদী, কালিগঙ্গা, কঁচানদী খননের মাধ্যমে পিরোজপুরকে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন। ভাণ্ডারিয়ার হাসপাতাল ময়দানে উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জেপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা জেপি’র আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল হক মনি জোমাদ্দারের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী লায়লা পারভীন, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জ্বল তালুকদার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, জেলা যুবলীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান ফুলু, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল আহসান গাজী, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, টুঙ্গীপাড়া আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাফিজুর রশীদ তারিক, উপজেলা জেপি’র সদস্য সচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, গৌরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, ইকড়ি ইউপি চেয়ারম্যান তানভির হোসেন তালুকদার বাবুল, জেপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব খলিলুর রহমান, যুবলীগের উপজেলা আহ্বায়ক এনামুল কবির টিপু তালুকদার, জেপি নেতা কামাউদ্দিন জোমাদ্দার, যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মান্নান, যুব সংহতির নেতা নাসির উদ্দিন দুলাল সরদার, শওকত ইকবাল মিটুল মল্লিক, ছাত্র সমাজ নেতা মোস্তফা সিকদার ও রাহাত জোমাদ্দার। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ফায়জুর রশীদ খসরু, লিয়াকত তালুকদার ছাড়াও নব-নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ মিরাজুল ইসলাম, সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার জোমাদ্দার, নদমুলা ইউপি চেয়ারম্যান সফিকুল কবির বাবুল তালুকদারসহ জেপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন রেনু, কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এনামুল কবির রুবেল, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির রাজু, কেন্দ্রীয় যুব সংহতির নেতা নূরুজ্জামান হোসেন প্রমুখ। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আশরাফ, ভাণ্ডারিয়ার ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশীদ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান প্রমুখ। সংবর্ধনায় আগত হাজার হাজার দর্শক শ্রোতার মনোরঞ্জনের জন্য সংসদ সদস্য ও ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজসহ একঝাঁক শিল্পী গান পরিবেশন করেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল সকালে ভাণ্ডারিয়া উপজেলার গৌরিপুর ইউনিয়নের পাতলাখালী ও ভূবনেশ্বর খালের ওপর স্লুইস গেট নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজ মোড় থেকে জামিরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভায়া হারুন ফরাজির বাড়ি সংলগ্ন খালের ওপর ২৬ ফুট দৈর্ঘ্য সেতু/কালভার্ট নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জ্বল তালুকদার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মাহবুবুর রশীদ, গৌরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী বজলুর রশীদ প্রমুখ। মন্ত্রী উপজেলা অডিটরিয়ামে কৃষি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ, জাটকা আহরণে বিরত থাকা জেলেদের মাঝে ভিজিএফ চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশীদ। এসময় বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। পরে মন্ত্রী উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলার উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। দুপুরে মন্ত্রী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও সকল কর্মকর্তার সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন । সভা শেষে উপজেলা পরিষদে সুইচ টিপে সোলার প্যানেলের উদ্বোধন করেন। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়। বিকালে মন্ত্রী ভাণ্ডারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি এ্যাম্বুলেন্সের চাবি হস্তান্তর ও হাসপাতাল মাঠে পোনা নদীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। গত বৃহস্পতিবার পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাণ্ডারিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সারাদিন ব্যস্ত কর্মসূচিতে অংশ নেন। এদিন রাতে তিনি নদমুলা-শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের হেতালিয়া নেছারাউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান করেন। সন্ধ্যায় তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তেলিখালী ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে এখানে আরো বক্তব্য দেন পিরোজপুর-৩ আসনের (মঠবাড়িয়া) সংসদ সদস্য ডাঃ রুস্তুম আলী ফরাজী, পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। মন্ত্রী এখানে জেলেদের মাঝে ভিজিএফ কর্মসূচির খাদ্য বিতরণ করেন। মন্ত্রী তেলিখালী গোলবুনিয়া সড়ক থেকে ইকড়ি বোর্ড স্কুল পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন কাজে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন, হরিণপালা আবাসন প্রকল্পের পুকুর খনন কাজ পরিদর্শন, হরিণপালা পদ্মার খালের স্লুুইস গেট থেকে মঞ্জু মার্কেট হয়ে আবাসন পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ দিন সকালে নদমুলা লিয়াকত মার্কেট থেকে দক্ষিণ শিয়ালকাঠি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পোনা নদী ভাঙ্গন রোধ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এলজিইডি’র অর্থায়নে তেলিখালী বাজারকে নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তেলিখালী ইউনিয়নের দু’টি পৃথক সমাবেশে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সরকার সব কিছু করে দেবে, জনগণ কিছু করবে না, এ ধারণা সঠিক নয়। এটা আমাদের রাজনৈতিক দুর্বলতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবকাঠামো সৃষ্টি করা। যাতে কাজ ও উত্পাদনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ দরিদ্র তথা উন্নয়নশীল দেশ। দেশের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন অনেক। সরকার যা আয় করে তা সারা দেশে ভাগ করে দেয়, এই সীমাবদ্ধ সম্পদ দিয়ে দেশের সকল চাহিদা পূরণ হয় না। মানুষ সচেতন হচ্ছে, যা কাজে লাগিয়ে উত্পাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই গরীব দেশে আল্লাহ আমাদের সে সুযোগ দিয়েছেন, তা ব্যবহার করে আসুন আমরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করি। বাংলাদেশে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বিশাল ভূখণ্ড জেগে উঠেছে। সরকার এখানে বিদেশি সহায়তায় বন সৃষ্টি করে ভবিষ্যত্ জমির সমস্যার সমাধান করতে চায়। আমাদের মত গরীব দেশে হিংসা-হানাহানির মত বিলাসিতা মানায় না। বিবাদ-ফ্যাসাদ দূর করে সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ঐক্য স্থাপন করে মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, নদীতে বেড়ি বাঁধ আর খালে স্লুইস গেট দিলে চলবে না, পানি নিয়ন্ত্রণ করে কৃষি সেচ প্রকল্প চালু করতে হবে। তিনি আরো বলেন, পাথরঘাটা-মঠবাড়িয়া-চরখালী-পিরোজপুর-বাগেরহাট-খুলনা-মংলা সড়কের উন্নয়ন আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। গত ২০ বছর আগেও পিরোজপুর ও বরিশাল থেকে মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়ক ছিল না। যা আমরা পরবর্তীকালে নির্মাণে সক্ষম হয়েছি। এ পথে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাছ পরিবহন হচ্ছে। যা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে দেশের উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি।