বেদখল চাক্তাই বাধাগ্রস্ত বাণিজ্য

আপডেট : ০৩ মে ২০১৪, ২৩:২০
বন্দরনগরীর বাণিজ্যিক খাল হিসেবে পরিচিত চাক্তাই খাল সুরক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। সিটি কর্পোরেশন অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করলেও সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী ও ব্যবসায়ীরা। অবৈধ দখলদার ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ‘চাক্তাই খাল’-এর বাণিজ্যিক ব্যবহার কমে গেছে। ময়লা-আবর্জনা, পাইলিং ও পাহাড়ের মাটি চাক্তাই খালের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। প্রায় ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট প্রস্থের খালের অধিকাংশ অংশে ২০ ফুট প্রস্থও নেই। খালের বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ও নিছে করে সেতু নির্মাণের কারণে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। বাণিজ্যিক খালের ঐতিহ্য হারাতে বসেছে চাক্তাই খাল। আগের মতো এই খাল দিয়ে নৌযানে করে পণ্য পরিবহন হয় না। জোয়ারের সময় মোহনা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার ভেতরে পণ্য পরিবহনকারী নৌযান প্রবেশ করতে পারে। পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খালের দু’পাশে অবস্থিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, খালের দুই পাশে সড়ক নির্মাণ না করলে চাক্তাই খালকে রক্ষা করা যাবে না। খালের পানি দূষণ রোধে মোহনায় স্লুইচ গেট নির্মাণ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে চাক্তাই খালকে মডেল হিসেবে তুলে ধারা যাবে। বন্দরনগরীর পূর্বাংশে অবস্থিত চাক্তাই খাল। চাক্তাই খালকে কেন্দ্র করে দুই পাশে শতশত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। চাক্তাই খালের পশ্চিম পাশে রয়েছে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ। আরো রয়েছে আশাদগঞ্জের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ঢেউটিন ও শুঁকটির পাইকারি বাজার। খালের পূর্বপাশে রয়েছে চাক্তাই বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে রয়েছে চাল, ময়দা, তেলসহ ভোগ্য ও ব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি বাজার। এছাড়া চাক্তাই খালের দুই পাশে বহদ্দারহাট পর্যন্ত অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন জানায়, কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত চাক্তাই খালের দৈর্ঘ্য ৬ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৪০ ফুট। কিন্তু খালের দুই পাশে বসবাসকারীরা ক্রমশঃ খালকে গ্রাস করে ফেলেছেন। খালের অংশবিশেষ দখলে নিয়ে নির্মাণ করেছে বহুতল ভবন। খালের সুরক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতি ও সময় মতো উদ্যোগ না নেয়ায় অবৈধ দখলদাররা তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। নব্বই দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চাক্তাই খালের প্রথম উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। তখন খালকে খনন ও অনেক কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। তবে অপরিকল্পিতভাবে খালের উপর কালভার্ট নির্মাণ করায় নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান। তারপরে দীর্ঘসময় চাক্তাই খালের বড় কোন উন্নয়ন হয়নি। কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলেছে। ৬ কিলোমিটার খালের অধিকাংশ এলাকায় তলা পাকা ও দুই পাশে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখল উচ্ছেদে কর্পোরেশনের কঠোর উদ্যোগ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অবৈধ দখল বজায় রেখে ইতিপূর্বে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়েছে। নগরীর ছোট-বড় বহু খাল চাক্তাই খালে গিয়ে মিলিত হয়েছে। বড় খালের মধ্যে রয়েছে চশমা খাল, মির্জা খাল, চট্টেশ্বরী খাল ও সাবএরিয়া খাল অন্যতম। তলা পাকা ও দেয়াল নির্মাণ করেও চাক্তাই খালকে পরিষ্কার রাখা যাচ্ছে না। ময়লা আবর্জনা নগরীতে নির্মিত বহুতল ভবনের পাইলিং ও পাহাড়ের মাটি গিয়ে খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবার পরিষ্কার করে আবর্জনা সরানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আবর্জনাবহনকারী গাড়ি চলাচল করতে পারে না। সিটি কর্পোরেশন চাক্তাই খাল পরিষ্কার রাখার জন্য দু’টি স্ক্যাভেটর কিনেছে। কিন্তু তার সুফল মিলছে না। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, বছরে একবার মাত্র খাল পরিষ্কার করা হয়। ৬ কিলোমিটার খালের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে বর্তমানে এক কিলোমিটার বেশি পণ্য পরিবহনকারী নৌযান চাক্তাই খালে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে নৌপথে পণ্য পরিবহন কমে গেছে। অনেকেই খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই থেকে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান ও রিক্সায় পণ্য নিয়ে চাক্তাই খালের মোহনায় নৌযানে লোড করছে। এতে বেড়েছে পণ্যের পরিবহন খরচ। এ প্রসঙ্গে সিটি কর্পোরেশন নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সালেহ ইত্তেফাককে বলেন. ‘চাক্তাই খালকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সড়ক নির্মাণ, মোহনায় স্লুইচ গেইট নির্মাণ, খালের দুইপাশে পানি দূষণ রোধে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও খালকে আরো গভীর করতে হবে।’ সিটি কর্পোরেশন খালের উপরের অংশে পশ্চিম পাশে তিন কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সড়কের প্রস্থ হবে ২০ ফুট। প্রায় ৫৭ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ প্রকল্পের মেয়াদ আগামী জুন মাসে শেষ হলেও এখনো পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ কাজও শুরু করতে পারেনি সিটি কর্পোরেশন।