বামদিকের ছবির দিকে তাকান। কি দেখছেন? একজন সাদামাটা চেহারার নারী। তাই না? এবার ডানে তাকান। ভীষণ সুন্দরী একজন তরুণী। ভাবছেন কোনো নায়িকা কিংবা মডেল হবে হয়তো। যদি বলা হয় এই দুটি ছবি আসলে একই নারীর, তাহলে কি বিশ্বাস করবেন?
হয়তো বলবেন, দু’জনের চেহারায় আকাশ-পাতাল ফারাক। তারা এক হতে পারে না। অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সার্জনরা। তারা নারীদের ঈশ্বরপ্রদত্ত চেহারা কেটেকুটে বদলে দিচ্ছেন প্রায় শতভাগ। সাধারণ চেহারার একজন নারীকে বানিয়ে দিচ্ছেন অসাধারণ। দেখলে মনে হবে কম্পিউটারে সুন্দর কোনো গ্রাফিক্স সফটওয়্যার দিয়ে এডিট করা ছবি। কোরিয়ান সার্জনদের এই অভাবনীয় সাফল্য বিপদে ফেলে দিয়েছে চীনকে। কারণ সেখানকার হাজার হাজার তরুণী ছুটছেন কোরিয়ায়। প্লাস্টিক সার্জারি করে মনের মতো করে নিতে চান তাদের চেহারা। সমপ্রতি ২৩ জনের একদল তরুণী কোরিয়া থেকে প্লাস্টিক সার্জারি করে দেশে ফিরছিলেন। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের আটকে দেয়। কারণ, যে পাসপোর্টে তারা দেশ ছেড়েছিলেন সেই পাসপোর্টে দেশে ঢোকার চেষ্টা করতেই আপত্তি তোলে ইমিগ্রেশন বিভাগ। কর্মকর্তারা দাবি করেন, এগুলো ভুয়া পাসপোর্ট। কিন্তু পাসপোর্টগুলো আসলে ভুয়া ছিল না। সেগুলো ছিল আসল। কিন্তু সমস্যা হলো পাসপোর্টে যে ছবি লাগানো আছে সেই ছবির সাথে সামনে দাঁড়ানো পাসপোর্টের মালিকের বিন্দুমাত্র মিল নেই। পাসপোর্টে এসব তরুণীর ছবিতে দেখা যাচ্ছে তাদের চোখ ছোট, নাক চাপা এবং চ্যাপ্টা চিবুক। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো মেয়েগুলোর মুখের গড়ন ঠিক তার উল্টো -বড় চোখ, উন্নত নাক এবং চিকন চিবুক।
তাদের মাথার বিশাল হ্যাটগুলো খুলতে বলা হলো। দেখা গেল মুখের এখানে সেখানে সেলাই। তারা জানালেন যে প্লাস্টিক সার্জারি করতে দক্ষিণ কোরিয়াতে গিয়েছিলেন। এরপর তাদের দেশে ঢুকতে দিতে আপত্তির কিছু ছিল না। যেসব জায়গায় ছুরি-কাঁচি চালানো হয়নি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সেসব স্থানের সাথে পাসপোর্টের ছবি মিলিয়ে দেখে পরীক্ষা করা হয় যে ছবিগুলো এসব তরুণীর ‘সাবেক’ মুখের কি না। এরপর তাদের যেতে দেয়া হয়। সাংহাই এয়ারপোর্টে একজন যাত্রীর পাসপোর্ট পরীক্ষা করতে গড়ে ৪৫ সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু এদের একেকজনের পেছনে ব্যয় হয় কয়েক মিনিট করে। তবে তাদের ছেড়ে দেয়ার সময় প্রত্যেককে সতর্ক করে বলা হয় যেন তারা নতুন চেহারার ছবি দিয়ে নতুন করে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এই পাসপোর্ট নিয়ে ভবিষ্যতে আর ইমিগ্রেশন পার হতে দেয়া হবে না। আর এজন্য যে সার্জনের কাছে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছেন তার কাছ থেকে চেহারা ‘সত্যায়িত’ করে আনতে হবে!
ব্রিটেনের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা জানায়, দক্ষিণ কোরীয় প্লাস্টিক সার্জনরা বিশ্বের সেরা সার্জনদের মধ্যে অন্যতম। তারা এত নিখুঁতভাবে চেহারা পাল্টে দিতে পারেন যে কারো পক্ষেই পরিবর্তিত চেহারা আর চেনা সম্ভব নয়। চেহারার দুই ‘ভার্সনের’ ছবি পাশাপাশি রেখেও মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কেবল চীন নয়, জাপানী তরুণীদের মধ্যেও প্লাস্টিক সার্জারি করার হিড়িক পড়ে গেছে। আর এই কাজে তাদেরও সবচে’ পছন্দের জায়গা হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। হলিউড, বলিউডসহ বিভিন্ন দেশের নায়িকা কিংবা মডেলদের প্লাস্টিক সার্জারি করে মুখের কিংবা শরীরের কোনো একটি প্রত্যঙ্গ সামান্য সংশোধন করে উন্নত করার কথা শোনা যায়। কিন্তু চেহারা পুরোপুরি পাল্টে ফেলার ঘটনা খুব বেশি শোনা যায় না।
দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক হাসপাতাল এখন প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ খুলেছে। এটা এখন তাদের জন্য ভীষণ লাভজনক বিভাগে পরিণত হয়েছে। সার্জারির পর বিদেশি রোগীদের সত্যায়ন সার্টিফিকেটও ইস্যু করছে বিপুল দামে।
২০১১ সালে প্রায় আড়াই হাজার মেডিক্যাল ট্যুরিস্ট দক্ষিণ কোরিয়াতে গিয়েছিল। কিন্তু গতবছর সেই সংখ্যা দশ গুণ বেড়ে ২৫ হাজার ১৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এদের বেশিরভাগ এসেছে চীন থেকে যাদের সিংহভাগ তরুণী। আর তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্লাস্টিক সার্জারি করা। দেশি সার্জনদের উপর তারা ভরসা রাখতে পারছেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার পত্রপত্রিকাগুলো বিষয়টি নিয়ে অগণিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার চিকিত্সা বিভাগও জানিয়েছে তাদের সার্জনদের নিয়ে দেশ গর্বিত। কেবল তরুণীরা নয়, এখন ‘রূপ সচেতন’ প্রসূতিরাও সন্তান জন্ম দেয়ার সময় উড়ে যাচ্ছেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। সন্তান জন্মদানের সময় সন্তানের কিংবা নিজের কোনোপ্রকার শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হলে কিংবা অস্ত্রোপচার করে সন্তান জন্মদানের প্রয়োজন হলে প্লাস্টিক সার্জনরা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিচ্ছেন তাদের শরীর! কারো বোঝার সাধ্য নেই যে সিজার করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরীয় সার্জন পার্ক বেয়ং দ্য কোরিয়ান টাইমস পত্রিকাকে বলেন, কয়েক বছর আগে চীনের একজন প্রতিষ্ঠিত গায়িকা তাদের দেশের প্লাস্টিক সার্জনের হাতে সার্জারি করানোর সময় মারা গিয়েছিলেন। বিষয়টি চীনা পত্রপত্রিকায় ঝড় তুলেছিল। এরপর থেকেই এই কাজে তরুণীদের দক্ষিণ কোরিয়ামুখী ঢল শুরু হয়।
