রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গত বছরের এই দিনে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হয়নি। এক বছর পরও এই ৪২টি মামলার একটি মামলারও চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এসব মামলায় হেফাজতের যেসব নেতাকে আসামি করা হয়েছে তারা এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রহস্যজনক কারণে অনেক নেতার ধারে-কাছেও যায়নি পুলিশ ও গোয়েন্দারা। আবার কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও তারা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান মামলার তদন্ত সম্পর্কে জানান, হেফাজতের সহিংসতার ঘটনায় দায়েরকৃত সবগুলো মামলার তদন্ত এখনো চলছে। ঘটনার পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মোট ৪২টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় দায়ের করা হয় ১৮টি মামলা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ মুহূর্তে ১৩টি মামলার তদন্ত করছে। তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এসব মামলার পরে বেশকিছু ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ এখন জামিনে রয়েছেন। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় প্রকৃত নাশকতাকারী এবং ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এ ঘটনা ঘটায়। এদের মধ্য থেকে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করতে কিছুটা সময় লাগছে। এ কারণে চার্জশিট দাখিল করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
গত বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে সকাল থেকে ভোররাত পর্যন্ত পুলিশের সাথে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সংঘর্ষে সরকারি হিসাবে ১৩ জন নিহত হন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, কোরআন শরীফ পোড়ানো, পুলিশের ওপর হামলা, ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতার পর গত বছরের ৫ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল থানায় ৮টি, পল্টন থানায় ৯টি ও রমনা থানায় ১টিসহ মোট ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়। পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও কাঁচপুরে পুলিশ ও বিজিবি’র সাথে সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হন। এসব ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় ২৪টি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তরা বাদী হয়ে এসব মামলা দায়ের করেন। বেশিরভাগ মামলা দণ্ডবিধি ৩০২/৪০৪/১০৯/৩৪/১৪৩/১৪৭/৪৩৫/৪২৭/৩৮৯/১০৯/১১৪/৩৪ ধারায় দায়ের করা হয়। সবগুলো মামলায় হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরীকে প্রধান আসামি করা হয়। এসব মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেনঃ হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুফতি ফয়জুল্লাহ, ঢাকা মহানগর আমির নূর হোসেন কাশেমী, ১৮ দলীয় জোট নেতা আব্দুল লতিফ নেজামী, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা মাইনুদ্দীন রুহী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ফরিদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, নায়েবে আমির মহিবুল্লাহ বাবু, তাজুল ইসলাম, আবুল মালেক হালিম, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, ফজলুল হক জিহাদী, নেজামে ইসলামের সাহিত্য সম্পাদক মুফতি হারুন ইজাহার, হেফাজতে ইসলামের অর্থ সম্পাদক মাওলানা ইলিয়াছ ওসমানী, মাওলানা মাহফুজুল হক, আবদুল কুদ্দুস, নুরুল ইসলাম, আবুল হাসনাত আমিনী, মোস্তফা আজাদ, মুফতি নুরুল আমিন। এছাড়া কয়েক হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে এসব মামলার আসামি করা হয়। তবে হেফাজতের আমীর শাহ আহমদ শফীকে কোন মামলার আসামি করা হয়নি। মামলায় গ্রেফতার করা হয় ২২ জনকে। আসামিদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরসহ বিএনপির কয়েকজন রয়েছেন।
গত বছর ৫ মে’র পরে হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, মুফতি ওয়াক্কাস ও মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়। এদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর অনেক বিষয় স্বীকার করেছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের মামলার তদন্ত শেষ করতে একটু সময় লাগে। তদন্তে নেমে অনেক নতুন নতুন তথ্য জানা গেছে। এসব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হতে এখনো সময় লাগবে।
কর্মসূচি : শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর হামলার ঘটনার এক বছর পূর্তিতে সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহালুল্লাহ ওয়াসেল জানিয়েছেন, দিনটিতে শহীদদের স্মরণে বারিধারা মাদ্রাসায় দুপুর ১২টায় মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বিকালে কামরাঙীরচর এলাকায় খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে একটি শোক মিছিল বের হবে। মঙ্গলবার লালবাগে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর কার্যালয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
