একের পর এক খুন, অপহরণের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি মানুষের মধ্যে এখন চাপা ক্ষোভ। আতঙ্কিত মানুষ এখন আর ঘরে বসে নেই। আইনজীবীদের ডাকা হরতালে তাই গতকাল রবিবার রাজপথে দেখা গেল সাধারণ মানুষকে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নজিরবিহীন এক হরতাল পালিত হয়েছে। খোলেনি কোন দোকানপাট, রাজপথে চলেনি কোন গাড়ি। এর জন্য কাউকে ভাঙচুর করতে হয়নি, ভয় দেখাতে হয়নি কাউকে। সবাই মিছিল করেছেন, বিচার চেয়েছেন এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের। পুরো নগরীই যেন পরিণত হয়েছিল মিছিল-সমাবেশের নগরীতে। এর মধ্যেই রাজপথে ক্রিকেট খেলেছে কিছু শিশু আর দোকান কর্মচারী। গতকাল নারায়ণগঞ্জে ছিল আইনজীবীদের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। বিএনপিসহ কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দল, ত্বকী মঞ্চ, আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এই হরতালে সমর্থন দিয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জের এই স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে অংশ নিতে রাস্তায় নেমে আসেন ব্যাংক কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, খুন আর অপহরণের কারণে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন পার করছেন। তাই কষ্ট হলেও মানুষ এই হরতালকে সমর্থন করছে। এই কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও আমাদের কোনো কষ্ট হচ্ছে না। আমরা চাই দেশ থেকে সকল প্রকার হত্যা আর অপহরণ বন্ধ হোক এবং হত্যায় জড়িতরা গ্রেফতার হোক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আজিজুল ইসলাম বলেন, এভাবে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আমরা কতদিন পার করব? আমরা আসলে এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত মুক্তি চাই। এদিকে হরতালে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ডা. খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানিয়েছেন।
শুধু হরতাল চলাকালে সাইনবোর্ড এলাকায় নুর হোসেনের একটি মার্কেটে হামলা ও ভাংচুর করে নজরুলের সমর্থকরা। পরে ওই মার্কেটটির নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিনের সমর্থকরা। এছাড়া ভোরে শহরে একটি বাসে ভাঙচুর করা হয়। হরতাল চলাকালে নারায়ণগঞ্জে কোনপ্রকার যানবাহন তো দূরের কথা রিক্সাও চলাচল করেনি। লঞ্চ ও ট্রেন চলাচলও বন্ধ ছিল। দিনভর সকল রাজনৈতিক দল এমনকি সাধারণ মানুষও খণ্ড খণ্ড মিছিল-সমাবেশ করেছে। সব সমাবেশ থেকেই খুনিদের গ্রেফতারের দাবি করা হয়। মিছিল-সমাবেশে অংশ নেয়া সাধারণ মানুষ এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চায়।
গতকাল ভোরেই শহর ও আশেপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। ভোর থেকে শহরে ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় বিজিবি টহল দিতে থাকে। ভোর ৬টার দিকে তৈমুর আলম খন্দকারের নেতৃত্বে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয় এবং পরে সিপিবি, বাসদ, সাংস্কৃতিক জোট, ত্বকী মঞ্চসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল করে। শহরের দুই নম্বর রেলগেইট এলাকায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে সিপিবি-বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ বিক্ষোভ করে। আইনজীবীরা প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে দিনভর মিছিল-সমাবেশ করেছেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সাধারণ মানুষও পথে বেরিয়ে এসে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মিছিল-সমাবেশে অংশ নেন। সবাই বুকে কালো ব্যাজ লাগিয়ে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও খুনিদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
এদিকে ভোরে ঢাকা থেকে একটি ট্রেন নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে ফতুল্লা রেলস্টেশনে ট্রেনটি আটকে দেয় জনতা। এরপর সরাদিনে আর ট্রেন চলাচল করেনি। নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার গোলাম মোস্তফা জানান, সকাল ৭টার দিকে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসা একটি ট্রেন পিকেটাররা ফতুল্লায় আটকে দেয়ার পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মহাসড়ক ছাড়া কোথাও যানবাহনও চলাচল করেনি। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সামনে কাউন্সিলরদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে অংশ নেন মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী।
প্রেসক্লাবের সামনে আইনজীবীদের সমাবেশে সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। তিনি বলেন, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। আমাদের হরতালে সমর্থন জানিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হরতাল পালন করেছেন।
ঢাকায়ও আইনজীবীদের বিক্ষোভ
অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারসহ ৭ জনের হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় সমাবেশ করেছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি ও বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদ। গতকাল ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় এই সমাবেশে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মহসিন মিয়া বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, আইনজীবী চন্দন সরকারের হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করে অনেক নাটক হচ্ছে। খুনিদের গ্রেফতার করুন, না হলে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আইনজীবী ঐক্য পরিষদের ঢাকা বারের সভাপতি সুনীল রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, বিচার হয় না বলেই একের পর এক আইনজীবীকে হত্যা করা হচ্ছে।
