নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ থেকে শুরু করে লাশ উদ্ধার পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। নূর হোসেন প্রকাশ্যে এক মাস পূর্বে কাউন্সিলর নজরুলকে হত্যা করার ঘোষণা দেন। নজরুল ও তার পরিবার পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। দলীয় শীর্ষ নেতাদেরকে জানানো হয়। কিন্তু কোন প্রতিকার না পাওয়ার পেছনে কারণ কী?
নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডের বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, হত্যাকাণ্ডের এক মাস পূর্বে তাকে ফোন করে এই বলে হুমকি দেয়া হয়, ‘র্যাবের পোশাক ক্রয় করেছে নূর হোসেন, তোর জামাইরে খুন করব।’ পাশাপাশি র্যাব দিয়ে হত্যা করানো হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। এসব বিষয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরব ভূমিকা পালন করার কারণ কী? অপহরণের সময় প্রকাশ্যে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ব্যস্ততম এলাকা থেকে র্যাব পরিচয়ে এবং র্যাবের পোশাক পরিহিত দুইজনসহ সশস্ত্র ব্যক্তিরা নজরুলসহ সাতজনকে তুলে নিয়ে যায়। অপহরণ প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। অদূরেই নারায়ণগঞ্জ আদালত ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং গোয়েন্দা কার্যালয় রয়েছে। কিন্তু কেউ এ অপহরণের বিষয়টি টের না পাওয়ার কারণ কি? অপহরণের সময় দুইটি মাইক্রোবাস এবং নজরুল ও চন্দন সরকারের ২টি গাড়ি ছিল। ৪টি গাড়ি নিয়ে অপহরণকারীরা নির্বিঘ্নে লিংক রোড দিয়ে চলে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টির বাইরে। এ প্রশ্ন সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর মুখে মুখে। মামলা করার পর প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ অভিযুক্তরা এলাকায় কিংবা বাসাবাড়িতে নির্বিঘ্নে অবস্থান করছিল। নূর হোসেন কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা ও দলীয় নেতার সঙ্গে এবং জলসাঘরের আসরে বসে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর পরই নজরুলের স্ত্রী ও শ্বশুরসহ আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকাবাসী নূর হোসেনের নেতৃত্বে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানান। তাকে গ্রেফতার করলে নজরুলসহ সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে বলেও তারা জানিয়েছিলেন। এমন আবেদনের পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নূর হোসেনসহ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেনি কেন?
অপহরণ করে হত্যার জন্য যথেষ্ট সময় দেয়ার জন্যই স্থানীয় পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নীরবতা পালন করেছিল বলে স্বজনহারাসহ এলাকাবাসীর অভিযোগ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মধ্যে নজরুল ও আইনজীবী চন্দন কুমারসহ সাতজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর ইট বেঁধে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার বিষয়টি এ নেটওয়ার্কের মধ্যে ধরা না পড়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এর উত্তর মিলেনি এলাকাবাসীর কাছে। একের পর এক সাতটি লাশ উদ্ধারের পর টনক নড়েনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এবং তদন্ত নিয়েও কোন তত্পরতা দেখা যায়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর। লাশ উদ্ধারের পরদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে হাজার হাজার লোক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নেমে আসলে শুরু হয় তদন্তসহ নানান তত্পরতা। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের ৫টি থানাকে দৈনিক লক্ষাধিক টাকা করে উেকাচ দিয়ে আসছিলেন নূর হোসেন। ঐ ৫টি থানার একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা নূর হোসেনের সোর্স হিসাবে কাজ করে আসছিলেন। ঘটনার সময় অপহরণের কাজে ব্যবহূত মাইক্রোবাস ও অভিযুক্তদের পালিয়ে যেতে ঐসব পুলিশ কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন। এসব পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি মাসে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্ধারিত হারে মাসোহারা দেন। এ কারণে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার বদলি হলেও ঐসব দুর্নীতিবাজ ঘুষখোর কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। সমপ্রতিকালে ব্যাটারি চালিত ১০ হাজার রিকশা আটক করে নূর হোসেন ও তার ক্যাডার বাহিনী। ২০টি রিকশার মালিক ছাড়া অন্য মালিকদের অটোরিকশা প্রতি ১০ হাজার টাকা করে ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ২০টি রিকশা নূর হোসেনের ক্যাডাররা অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত রিকশা মালিকরা ঐসব অভিযোগ থানা পুলিশের কাছে দিলে কোন প্রতিকার হয়নি।
